Sharing is caring!

Photo

অদ্ভুত আলো
দ্বীনী আফরিদা আশরাফী (ময়ূরাক্ষী)
৬ষ্ঠ শ্রেণী, সময়কাল-সেপ্টেম্বর-২০১৫

মৌসুমি ৯ম শ্রেণীতে পড়ে। সে খুব সাহসী মেয়ে। সে ভিকারুন্নেসা স্কুলে পড়ে। তাদের ক্লাসে সে ফাস্টগার্ল। সে বিভিন্ন বিষয় বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে।
একদিন সে ও তার বান্ধবিরা তাদের বান্ধবী শামীমার বাসায় গেল। শামীমা কোন কারণে যেন চায়না যে কেউ তার বাসায় আসুক। সে সব সময় বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এবার সবাই জোর করে তাদের বাসায় চলে এল।
তাদের বাড়িটা যেন বিশাল জজ্ঞলের মাঝে অবস্থিত। বাড়িটা তাদের বিদ্যালয়ের দ্বিগুন বড়। বাড়ির চারিদিকে আছে বটগাছ, আমগাছ, বড়ইগাছ, কড়ইগাছ, তালগাছ, তেঁতুলগাছ। জজ্ঞলধরণের এই বাগানের মাঝে বিশাল পুকুর। পুকুরের পাশেই বিশাল বাঁশঝাড়।
দেখলেই গা ছমছম করে। বাড়িটা অনেক পুরানো কিন্তু বোঝার উপায় নেই। তারা অনেক খুশি। তারা সেখানে দুই/তিনদিন থাকবে, পিকনিক করবে।
পিকনিক করার জায়গাটা ঠিক করতে অবশ্য শামীমার সাথে বেশ ঝগড়া করতে হল। সবার পিকনিক স্পট হিসেবে বাঁশঝাড় বেশ পছন্দ হল। বাধ সাঁধলো শামীমা। সে সেখানে পিকনিক করতেই দিলনা। শেষ পর্যন্ত বাড়ির উঠোনেই পিকনিক করার সিদ্ধান্ত হল।
সেদিন বিকেলে
মৌসুমীর একটা সমস্যা আছে। সে কোনও কিছু ভাবতে শুরু করলে, সে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কিছুই খেয়াল থাকে না। তো সে তার অভ্যাস অনুযায়ী, শামীমার আচরন নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাসা থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাঁশঝাড়ের কাছে চলে এল। সে ভুলেই গেল যে শামীমা তাদের হাজার বার করে সেদিকে যেতে নিষেধ করেছে।
হঠাৎ বাঁশঝাড়ের ভেতর আলো দেখে তার ভাবনায় ছেদ পড়ল। সে কাছে গিয়ে দেখল, আলোচা সবুজ এবং হঠাৎ এক বৃদ্ধ মহিলার রূপ ধারণ করল। তার হাতের ব্যাগ সবুজ আলোয় আলোকিত। মৌসুমী সাহস সঞ্চয় করে তার কাছে গেল।
মৌসুমী-আপনী কে?
-আমি এই বাড়ির একজন শুভাকাক্সিখ। বিপদে সবার অজান্তে আমি এই বাড়ি রক্ষা করি।
-মানে? বাড়িটার কী কোন?
শামীমা- মৌসুমী… মৌসুমী…. কোথায় তুই।
কথা শেষ করার আগেই সে শুনলো শামীমার ডাক ও বৃদ্ধার সবুজ আলোর রূপ নিয়ে বাঁশঝাড়ের গভীরে মিলিয়ে যাওয়া। ততক্ষনে শামীমা সেখানে পৌঁছে গেছে।
শামীমা- মৌসুমী। ভালো হল তোকে খুঁজে পেলাম।
-কেন? আমি কী ছোট বাচ্চা, যে হারিয়ে যাব।
এসব বাদ দে, বাসায় চল।
তুই এরকম কেন করছিস।
সেটা জানতে চাস না। আমি অনুরোধ করছি।
মৌসুমী কোনও কথা বাড়ালোনা। আসলে শামীমার সাথে ঝগড়া সম্ভব না। সে ডিবেট চ্যাম্পিয়ন। মৌসুমী বুড়ির কথাটাও তাকে জানাল না।
খেয়ালী-তুই একা বেরিয়ে চলে এলি।
মেঘলা- আমাদের তো শামীমা বেরই হতে দিল না।
চৈতি- কাল থেকে আমরাও শামীমাকে না বলেই বের হয়ে যাব।
শামীমা- খবরদার, এখন এসব কথা বন্ধ কর।
চিত্রা- কিন্তু
শামীমা- কোনও কিন্তু না।
খেয়ালি- বাইরে না যেতে পারলে করব কী?
মৌসুমী- চল বাড়িটা ঘুরে দেখি।
শামীমা- কিন্তু….
চৈতি- কিন্তু কিন্তু বন্ধ কর, আমরা যা করতে চাই, তাতেই নিষেধ।
চিত্রা- আমরা বাড়ি দেখবই। দেখি কী করে বাধা দিস। বিকেলটা বাড়ি দেখতেই কেটে গেল। এত সুন্দর বাড়িতে আসতে কেন শামীমা নিষেধ করছিল সেটা কেউ বুঝতে পারল না।
রাতে গান কবিতার আসর বসল। তারপর সবাই নিজেদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করল। সবাই এক ঘরে ঘুমালো। কেউই এত বড় ঘরে একা শুতে চাইলনা। শুধু মৌসুমীর ঘুম হলনা। বারবার ঐ বৃদ্ধার কথা মনে পড়তে লাগলো। সে কোন বিপদের জন্য বাড়িটা রক্ষা করছে। এক বৃদ্ধা এত বড় বাড়ি কিভাবে রক্ষা করবে। আর সে আলোই কী করে হল? সাধারণ মানুষ কখনো আলো হতে পারবে না।
সকাল ৮টায়
চৈতি- মৌসুমী… মৌসুমী… ওঠ। আর কত ঘুমাবি?
মৌসুম- একটু গুমোতেও দিবিনা।
চিত্রা- না দেবনা। তুই নাকি ভোর ৪টায় উঠিস। এই ভোর ৪টা।
মৌসুমী-বাজে কথা বলিস না তো। কাল সারারাত ঘুম হয়নি।
খেয়ালী- কেন?
মৌসুমী তখন সবকিছু তাদের বলল। তখন তারা বাঁশঝাড়ের রহস্য উদঘাটনের উদ্দেশ্যে শামীমাকে না বলে সেখানে চলে গেল।
তারা হঠাৎ বাঁশঝাড়ের সবুজ আলো দেখে সেখানে গেল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না।
কী, দেখলি?
কিছুই না।
খেয়ালী- এখন এখান থেকে চলতো।
হঠাৎ সবাই লাল শাড়ি পরা কিশোরী দেখতে পেল। তার ব্যাগটি লাল আলোই আলোকিত। সে মুখে বিষন্নতা নিয়ে বাঁশঝাড়ের কাছে গেল। তারপর লাল আলোয় পরিনত হয়ে চলে গেল।
সবাই, প্রাণপন দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি পোঁছালো। তারা কেউ সেসব শামীমাকে জানাল না।
রাতের ঘটনা দুটো হল বলার মত। ঐ ঘরের সবুজ ডিম লাইট জ্বালানো মাত্রই সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
শামীমা-তোরা এত ভয় পেলি।
মৌসুমী- কই, না তো।
শামীমা-খেয়ালী, তুই কাঁপছিস কেন?
চিত্রা- কারণ আমি ওকে ঝাঁকাচ্ছি, এই দেখ।
খেয়ালী- অ্যাঁ ….., ঝাঁকাচ্ছিস কেন?
শামীমা- তোরা এক বিছানায় কেন?
খেয়ালী- মিথ্যা বলার মহোৎসবে যোগ দিল।
খেয়ালী- গল্প করব তাই।
চিত্রাও পিছিয়ে থাকল না।
চিত্রা-খুব মজা হবে।
তারা শামীমাকেও বিছানায় ডেকে নিল। রাতে কারোই ঘুম হল না। বিছানা নিয়ে সমস্যা ছিলনা, সমস্যা হল অন্য জায়গায়। কেউই আলোর কথা ভুলতে পারলনা। এর মাঝে খেয়ালী বেশী ঘুমায়। তাই সে ঘুমিয়ে গেল। আর কিছুক্ষনের মধেই উপর থেকে সোজা নিচে। ভাগ্য ভালো শামীমা ঘুমিয়ে ছিল। মৌসুমী সবাইকে বলল সকালে মৌসুমীকে সব জানাব।
সকালে
কারোর রাতে ঘুম আসেনি। যখন সবার একটু ঘুম এসেছে, পাশের জারুল গাছের উপর একটা পেঁচা ডাকতে শুরু করেছে। বিছানা থেকে আবারও পড়ে যাওয়ার ভয়ে খেয়ালীরও ঘুম আসেনি।
সূর্য উঠার অনেক আগে কোথায় যেন এ্যালার্ম বেজে উঠল। তখন শামীমা উঠে যা দেখলো, তা মোটামুটি হাস্যকর পরিস্থিতি। সে দেখল, সবাই বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের নিচে কালি, চুল এলোমেলো। শামীমাতো হেসেই অস্থির।
শামীমা- তোদের এরকম অবস্থা?
খেয়ালী- সারারাত গল্প করেছি, তাই।
চিত্রা- ঐটা কেউ বল।
চৈতি- কোনটা?
মৌসুমী- রাতে যেটা বললাম।
খেয়ালী- তুই বল।
চিত্রা- না তুই বল….।
মৌসুমী- শামীমা হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করে নে। তোর সাথে কথা আছে।
হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসতে বুঝল, তার আজ ব্রেকফাস্ট হবেনা। কারণ পরোটা সে সহ্য করতে পারেনা। খেয়ালীরও একই অবস্থা। তাই তারা সবার চোখ এড়িয়ে বারান্দায় এসে বসল। কিছুক্ষন পরে সূর্য উঠবে। হঠাৎ লাল আলো ও সবুজ আলোর ব্যাগ হাতে বৃদ্ধা ও মেয়েটিকে দেখে সবাইকে ডেকে আনল। তারা দেখল-
মেয়েটি বাড়ির চারিদিকে লাল আলো ছড়িয়ে দিল, দখন একটি পাথরের দেয়াল দৃশ্যমান হল। বৃদ্ধা সবুজ আলো দিতেই তা বাতাসে মিলিয়ে গেল। মেয়ে আর বুড়িটা সূর্য উঠার সাথে সাথে আলোর রূপ ধারণ করে বাঁশঝাড়ে চলে গেল। মৌসুমী শামীমাকে সব জানাল।
শামীমা- সবাই তার মানে ঠিকই বলে। সত্যিই এক পাথরের দেয়াল আড়াল করে রাখে….।
মৌসুমী- কোনও কারন ছাড়া তো বাড়িটা কেউ রক্ষা করবে না।
শামীমা- বাড়ির চারপাশের এত গাছ থেকে অনেক কাঠ পাওয়া যাবে। তাই দখলবাজরা বাড়িটা দখল করতে চায়। এছাড়া বাড়িটা ভেঙ্গে শপিং মল করতে চায়। কিন্তু ঐ মেয়ে ও বৃদ্ধার বাড়ি রক্ষা করে লাভ কী?
মৌসুমী- আমার মনে হয় ওরা, কোন মেয়ে বা বৃদ্ধা না। বরং অন্য কিছু। ওরা ওই বাঁশঝাড়ে থাকে বলে তোদের উপর এদের আলাদা কোন মায়া আছে।
শামীমা- তুই হয়তো ঠিক বলছিস। আমি কখনো তাদের ভুলবনা।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *