Sharing is caring!

৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

আমাদের পরিবেশ হোক তামাকমুক্ত

শাহাদাত আনসারী

অধিক জনসংখ্যার সীমিত ভুখন্ডের সোনার দেশ এ ‘বাংলাদেশ’। এদেশে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী তামাকের চাষ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩১ মে রবিবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ‘তামাক কোম্পানির কূটচাল রুখে দাও, তামাক ও নিকোটিন থেকে তরুণদের বাঁচাও’ শ্লোাগান নিয়ে তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। বিশ্বের উচ্চ ও উচ্চ-মধ্য আয়ের কয়েকটি দেশে তামাক ব্যবহারের পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশে এর উপর সবচেয়ে কম শুল্কায়নের কারণে তামাক গ্রহণকারীর সংখ্যা আসঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। খাদ্যের জমিতে তামাক চাষ খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। দিন দিন তামাক চাষ বিভিন্ন খাদ্য ভান্ডারের জমি দখল করে নিচ্ছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনকারী জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভান্ডার বলে পরিচিত চলনবিল এখন দখল করে নিচ্ছে তামাকে। পার্বত্য এলাকাতে চাষাবাদের ছোঁয়া পৌঁছে গেছে কৃষকদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুসারে স্বাস্থ্য হানিকর ভেষজ নিষিদ্ধের কথা বলা হলেও বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। তাই তামাকের চাষ, গ্রহণ এবং ক্ষতিকর প্রভাব বেড়েই চলেছে।
তামাকের ইংরেজি ‘ঞড়নধপপড়’ এসেছে স্প্যানিশ ‘‘ঃধনধপড়’’ শব্দ থেকে। এই শব্দটির উৎপত্তি আরাওয়াকান ভাষা থেকে। তামাক গাছের আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায়। তামাক গাছের শুকানো পাতাকে তামাক বলা হয়। তামাক গাছ ১২-১৮ ইঞ্চি লম্বা হয়। এটি নেশাদায়ক পদার্থ। তামাকে আগুন দিয়ে সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, হুঁকো, ও অন্যান্য ধুমপানের মাধ্যম প্রস্তুত করা হয়। ধুমপান ছাড়াও তামাক বিভিন্ন মাধ্যমে জর্দা, খৈনি, নস্যি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তামাকের মূল নেশাদায়ক উপাদান নিকোটিন এক প্রকারের স্নায়ুবিষ (নিউরোটক্সিন), যা এক ধরনের অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টরের (কোলিনার্গিক অ্যাসিটাইলকোলিন রিসেপ্টর) উপর কাজ করে।
প্রথমদিকে তামাক চাষ কম হলেও ২০০৯-১০ সালের শুরু থেকেই তামাক কোম্পানিগুলা কৃষককে পাতার দাম বাড়ানোর লোভ দেখায়। এতে কোম্পানিগুলা আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ জমি এবং নতুন নতুন জেলা তামাক উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে রাঙ্গামাটি, চলনবিল, নাটোর, যশোর, ঝিনাইদহ, লালমনিরহাট, রংপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, পাটুরিয়া এবং টাঙ্গাইলে ব্যাপক জমি তামাক চাষের আওতায় আনা হয়েছে। তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক জানা স্বত্বেও বিভিন্ন তামাক কোম্পানির লোভনীয় প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে কুষ্টিয়া জেলার চাষীরা তামাক চাষে কোমর বেঁধে নেমেছে। কুষ্টিয়া জেলায় মোট চাষের জমির প্রায় ৩৬% তামাক চাষের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়াতে তামাক চাষ ৩ গুণ বেড়েছে। কুষ্টিয়ার মোট ৬টি উপজেলার মধ্যে দুটি উপজেলায় দৌলতপুর এবং মিরপুরে সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হয়। এখানে প্রায় ৯২০০০ একর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে। কুষ্টিয়ার মোট তামাক চাষের আওতায় আনা জমির প্রায় ৯১% এই দুটি উপজেলাতেই রয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষকরা অধিকাংশই দরিদ্র। এক ফসল ঘরে তুললেও নতুন ফসল উৎপাদনের জন্য কোন অর্থ তাদের হাতে থাকে না। তাই ঘরের ফসল বিক্রি করে নতুন ফসল ফলানোর কাজে ব্যয় করা হয়। তাদের এ দারিদ্র্যতাকে কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো ফায়দা হাসিল করছে। শর্ত সাপেক্ষে সার কীটনাশক প্রদানসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য চাষীরা ঝুঁকে পড়েছে তামাক চাষে। কোম্পানির নানামুখী কৌশলে তামাক চাষে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। এ কারণে অনিচ্ছায় তামাক চাষ বেছে নিতে হয়েছে। যেমন, প্রতি একর জমিতে টোব্যাকো কোম্পানি ২০ হাজার টাকা করে ঋণ দিচ্ছে। পাশাপাশি বীজ ও সার দিচ্ছে। এ জমিতে ধান-পাট বা অন্যান্য ফসল আবাদ করে লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। দাম কম হওয়ায় আবাদের খরচ পুষিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। আর প্রাকৃতিক দূর্যোগ তো রয়েছেই। কিন্তু কৃষকদের ধারনা তামাক চাষে পরিশ্রম বেশি হলেও আয় বেশি। এ চাষ ছেড়ে সবজি চাষে পরপর দু’বছর তেমন কোন সুবিধা করতে পারা যায় না। কোম্পানির দেয়া শর্ত মেনে নিয়ে সার ও কীটনাশক পাওয়া গেলেও তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক জানার পরও তামাক চাষে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন এনজিও তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বিকল্প ফসল আবাদ করার পরামর্শ দিলেও চাষীরা তা মানতে নারাজ। কারণ তামাকের জমিতে নতুন করে অন্য ফসল আবাদ করলে প্রথমে ভাল ফল পাওয়া যায় না। তাই চাষীরা কোম্পানির দেয়া প্রলোভনে পড়ে তামাক চাষে ঝুঁকছে।
তামাকে প্রধানত বিশাক্ত পদার্থ নিকোটিন থাকে। এছাড়াও নানা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ থাকে, যেমন বেঞ্জোপাইরিন ইত্যাদি বহুচক্রী আরোমাটিক যৌগ। একটা সিগারেটে যতটুকু তামাক আছে তা শরীরে প্রবেশ করলে এতে দ্রæত মৃত্যু অনিবার্য। তবে ধুমপানের ফলেও ধীরে ধীরে আয়ু কমে আসে এবং হৃদরোগের জন্যও তামাকের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। তামাকের উচ্ছিষ্টাংশ হৃদপিন্ডে ঢুকে ক্যান্সারসহ মরণ ব্যাধি হতে পারে। আর এ কারণে অধিকাংশ লোকই নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের কিংবদন্তি লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে মূলত ধূমপানজনিত কোলন ক্যান্সারকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এক জরিপে জানা যায় বাংলাদেশে ধুমপানের কারণে প্রতি বছর ৬০ হাজার মানুষ মারা যায় এবং তামাকজনিত কারণে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
খাদ্যের জমিতে তামাক চাষ খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। তামাক চাষ বিভিন্ন খাদ্য ভান্ডারের জমি দখল করে নিচ্ছে। জমিতে তামাক চাষের ফলে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্যে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
তামাক চাষ শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, এই বিষবৃক্ষ চাষ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিপনন সকল ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত করছে জনসাধারণকে। তামাক পাতা উঠানোর মৌসুমে বাড়ীর নারী, পুরুষ শিশু-কিশোর সকলকে এক সাথে মাঠে কাজ করতে হয়। এ সময় শিশুরা স্কুল কামাই করে তাদের অভিভাবকদের সাথে মাঠে কাজ করে। ফলে তামাক চাষীদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবে তাদের শিক্ষাজীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তামাকের রাসায়নিক ও কীটনাশক মাটির উর্বরতা হ্রাস, পানি ধারণ ক্ষমতা নষ্ট এবং ক্ষয় বৃদ্ধি করছে। এছাড়া বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য, বনভূমি, পানি, জলজ প্রাণী, পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ও জলাশয়ের ঢালু উর্বর জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ করায় এ জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও তামাকের রাসায়নিক গিয়ে নদী-জলাশয়ের পানিতে মেশায় সে পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। আবার রাসায়নিক সার ও কীটনাশকগুলো পানির সাথে মিশে গিয়ে সুপেয় পানির উৎস নষ্ট করছে।
তামাক পাতা শুকানোর সময় উক্ত এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কাঠ, তুষ বা খড় পোড়ানোর ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। পার্বত্য এলাকায় তামাক পাতা শুকানোর জন্য ব্যাপকভাবে বনাঞ্চলের গাছ কাটা হচ্ছে, বনভূমি ধ্বংস করছে। তামাক চাষ করার ফলে কৃষক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, টানা কয়েকদিন তামাক পোড়ানোর পর অনেক কৃষক এত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তারা শয্যাশয়ী হয়ে পড়েন। তামাক পোড়ানো শেষে কৃষকের বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, শারীরিক দূর্বলতা দেখা যায় ।
সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুসারে স্বাস্থ্য হানিকর ভেষজ নিষিদ্ধের কথা বলেই শেষ করেছে। এক্ষেত্রে শুধু সংবিধানে থাকলেই হবে না এর কার্যকর প্রায়োজন। তামাকের উপর নির্ভরশীল চাষী ও শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে পরিকল্পনা নিয়ে ঋণের মাধ্যমে অন্য কাজে বা চাষে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। তামাকের উপর শুল্ক বৃদ্ধি করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। তামাকের খাপের গায়ে লেখার পাশাপাশি ক্ষতিকর রোগের চিত্রও দিতে হবে। পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে সরকারের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। ধূমপানে যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তা কার্যকর করতে হবে।
শুধু সরকার ইচ্ছা করলেও তামাকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে পুরোপুরি সফল হতে পারবে না। তাই সরকারের পাশাপাশি জনসাধারণকেও এগিয়ে আসতে হবে। জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার এবং পাড়া-মহল্লায় ক্যাম্পেইন করে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব জনসাধারণকে জানাতে হবে। পরিবারের কোন সদস্য তামাকের প্রতি আসক্ত হলে তা ছাড়ার জন্য ভালো করে বুঝিয়ে পরামর্শ দিতে হবে।
তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ও প্রসারের অর্থ হচ্ছে মানুষের রোগ ও মৃত্যুর কারণকে প্রসারিত করা। তাই এখন এই ক্ষতিকর পণ্যের উপর সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এখন তামাকের চাষ যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তা থামাতে ব্যর্থ হলে আমাদের দেশের পরিবেশ, শিক্ষা, অর্থ ও খাদ্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করবে। এখনও সময় আছে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের তরুণ সমাজকে বাঁচানোর জন্য এর চাষ ও ব্যবহারের প্রতি নিয়ন্ত্রণ এনে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। আগামীতে তামাকমুক্ত ও বসবাস উপযোগী বাংলাদেশ গড়ার জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে সরকার ও জনসাধারণ এগিয়ে আসবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *