Sharing is caring!

এবতেদায়ী শাখা যখন ‘মোহাম্মদপুর দারুল

কুরআন ইসলামী একাডেমী’

♦ স্টাফ রিপোর্টার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখা বর্তমানে ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’তে পরিনত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এবতেদায়ী শাখায় ১ম, ২য় ও ৩য় শ্রেণীতে শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থী আছে তবে বাস্তবে নয়, খাতায়। থাকলেও শ্রেণীতে ২ থেকে ৫ জন। ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীতে আছে, তবে হাতে গোনা কয়জন শিক্ষার্থী। এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী না থাকলেও একজন শাখা প্রধান মো. শামসুল হক, সহকারী শিক্ষক মোসা. আমেনা বেগম (সুপারের স্ত্রী), মো. আব্দুল করিম ও মো. আব্দুল আলিম। মোট ৪জন শিক্ষক প্রতি মাসে সরকারী কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাদী উত্তোলন করছেন ঠিকই। এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী থাকা বা না থাকা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই মাদ্রাসার সুপার মনিরুল ইসলামের বা সংশ্লিষ্ট এবতেদায়ী শাখার শিক্ষকদের। তবে শিক্ষার্থী আছে ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমীতে। মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী ভর্তির কোন উদ্যোগ বা মাথাব্যাথা না থাকলেও ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’ শাখায় যেন শিক্ষার্থী ভালোমত থাকে সেটা করতে সচেষ্ট মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মনিরুল ইসলাম। কারণ সেখানে তাঁর আর্থিক স্বার্থ জড়িত। এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী না থাকলেও সরকারের কোষাগার থেকে মাস গেলেই তো বেতন-ভাদাতী পরিষোধ করা হচ্ছে। এবতেদায়ী শাখায় সুপারের স্ত্রী সহকারী শিক্ষক আমেনা বেগমসহ রয়েছে মোট ৪জন শিক্ষক। সুপারের স্ত্রী হওয়ায় সঠিক সময়ে প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে, প্রতিষ্ঠান চলাকালিন কোন এক সময় গিয়েই শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আসেন আমেনা বেগম। বেতন-ভাতা উত্তোলন করে খুব ভালোই কাটছে শিক্ষকদের দিন। কিন্তু ব্যক্তি¯স্বার্থের জন্য মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার দিকে নজর দেয়ার সময় নেই সুপার মনিরুল ইসলামের। মোহাম্মদপুর মাদ্রাসা চত্বরে ব্যবসায়ীকভাবে গড়ে তোলা ৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’ ‘হিফজুল কুরআন একাডেমী’ ও ‘মক্তব’) একটি প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদপুর নূরাণী ইসলামী একাডেমী। সুত্রে জানা গেছে, এখানে রয়েছে প্লে শ্রেণীতে ২৫ জন (বেতন ১২০ টাকা), নার্সারীতে ২৬ জন (বেতন ১৪০ টাকা), ১ম শ্রেণীতে ১৫জন (বেতন ১৫০ টাকা), ২য় শ্রেণীতে ২৫ জন (বেতন ১৬০ টাকা), ৩য় শ্রেণীতে ১৭ জন (বেতন ১৭০ টাকা), ৪র্থ শ্রেণীতে ১১ জন (বেতন ২০০ টাকা), ৫ম শ্রেণীতে ৮জন (বেতন ২০০ টাকা)। একাডেমীতে মোট শিক্ষার্থী প্রায় ১’শ ২৭ জন। কিন্তু এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী বা বাস্তবে ২০জনও তবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। অবশ্য ভূয়া শিক্ষার্থী ভর্তি দেখিয়ে রাখা হয়েছে খাতায় বলেও সুত্রটি জানিয়েছে। এই একাডেমীতে মোট ৭জন শিক্ষক। এর মধ্যে ৫জনের কাছ থেকেই মোটা অংকের টাকা নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন একাডেমীর পরিচালক পদধারী মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার সুপার মো. মনিরুল ইসলাম। এসব শিক্ষকের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগ দিয়েছেন একাডেমী রেজিষ্ট্রেশন হলে ভালো বেতন এবং একাডেমী থেকেও প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধিসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের একটা অংশ তাঁর স্ত্রী আমেনার নামে থাকা প্রভিডেন্ট ফান্ড নামে স্থানীয় একটি এনজিওতে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে জমা দিতে বাধ্য করা হয় একাডেমীর প্রধানকে। বর্তমানে যা ৩৫০০ হাজার টাকায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বেতন উত্তোলনের পর এখানকার শিক্ষকদের বেতন ঠিকমত না হলেও ওই টাকা রীতিমত জমা দিতে হয়। আবার শিক্ষকদের ১২ মাসের জায়গায় বেতন দেয়া হয় ১০ মাসের। বাকি ২ মাসের টাকা নিজ পেকেটস্থ করেন মনিরুল ইসলাম। এছাড়াও বিকেলে কোচিং এর ফি থেকে যে অর্থ উত্তোলন হয়ে সেখান থেকেও ১০% টাকা নিয়ে নেন একাডেমীর পরিচালক মনিরুল। সব মিলিয়ে একাডেমীর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা ভোগ করাই মনিরুল ইসলামের আসল উদ্দেশ্য। যদিও তিনি এলাকার মানুষের মাঝে প্রচার করে থাকেন এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রসারের জন্য। মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করলে, সেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ বা বেতন আদায় করা যাবে না, তাই বিকল্প হিসেবে মাদ্রাসার চত্বরেই নতুন করে ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে প্লে থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেতন নেয়া হয়। বর্তমানে আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন একাডেমীতে নিয়োগ থাকা শিক্ষকদের উপর মানষিক নির্যাতন চালিয়ে চাকুরীচ্যুত করে আবারও নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবে। এছাড়াও একই চত্বরে রয়েছে ‘মক্তব’ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানেও ১২ থেকে ১৫ জন ছাত্র রয়েছে। এসব ছাত্রদের কাছ থেকেও বেতন নেয়া হয় ৫’শ টাকা করে মাসিক। সেখান থেকেও অর্ধেকেরও বেশী টাকা হতিয়ে নেন প্রতি মাসেই সুপার মনিরুল। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করে ভালো অংকের আর্থিক লাভের ব্যবস্থা করেছেন সুপার মনিরুল ইসলাম বলে মনে করছেন এলাকাবাসী ও শিক্ষানুরাগীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’র শিক্ষক ও দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকরা এসব অনিয়ম ও অর্থিক সুবিধাভোগের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শিক্ষকদের সব সময়ই মানষিক অত্যাচার ও চাপের মুখে রাখেন সুপার ও পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম। যেন কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস না পায়। এলাকার মানুষের সাথেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম করে প্রতারণা করছেন তিনি। এলাকার মানুষকে ধোকা দিয়ে নানাভাবে আর্থিক সুবিধাগুলোও ভোগ করছেন। মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদে সভাপতিসহ তাঁর আত্মীয়রা এবং দলীয় লোকজন (জামায়াতের) থাকায় তিনি বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা কার্যক্রম। গত ৬ ও ৭ অক্টোবর ‘দৈনিক চাঁপাই দর্পণ’ ‘দৈনিক মানবকণ্ঠ’সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার সুপার মনিরুল ইসলামের দূর্ণীতি-অনিময় ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই এলাকার মানুষের কাছে জবাবদীহিতা করতে না পারলেও বা সৎ সাহস না থাকলেও, তিনি বিভিন্ন অফিসে দেনদরবার ও দৌড়াদোড়ি শুরু করেছেন। মাদ্রাসার শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম ও আব্দুল আলিমকে দিয়ে তাঁর দূর্ণীতি ও অনিয়মের আর্থিক বিষয়গুলি ধামাচাপা দেয়ার জন্য নতুন করেন কাগজপত্র তৈরী করছেন বলেও একাধিক সুত্রে জানা গেছে। দূর্ণীতি ও অনিয়ম ধামাচাপা দিনে নানান ফন্দি করছেন তিনি। মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি তাঁর চাচা শশুর আলহাজ্ব আহসান আলী মাস্টারসহ পরিবারের বা আত্মীয় সদস্যদেরকে নিয়ে বিভিন্ন দরবারে ছুটছেন নিজেকে নির্দোষ প্রমান করার জন্য বলেও এলাকাবাসী ও প্রতিষ্ঠান সুত্রে জানা গেছে। এবতেদায়ী শাখায় ছাত্র-ছাত্রী না থাকা, মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার মধ্যেই আরও একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে আর্থিক সুবিধা ভোগ করা, মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখায় ক্লাশ না হওয়া, শিক্ষকদের শিক্ষার প্রতি জবাবদীহিতা না থাকাসহ এবতেদায়ী শাখার বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার প্রধান মো. শামসুল হকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী নেই, এটা সত্য নয়, তবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া তিনি জানান, মোহাম্মদপুর ‘মোহাম্মদপুর দারুল কুরআন ইসলামী একাডেমী’ মাদ্রাসারই একটি অংগ প্রতিষ্ঠান। এবতেদায়ী শাখায় শিক্ষার্থী না থাকলেও নূরানী শাখায় ভালোই শিক্ষার্থী আছে। এবতেদায়ী শাখার ‘খ’ শাখা একাডেমী। একই প্রতিষ্ঠানের শাখা কিভাবে হয়, বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার সুপার মো. মনিরুল ইসলাম আমাদের যেভাবেই বলেছেন, আমরাও সেভাবেই বলছি। আর্থিক সুবিধা ভোগের বিষয়টি তিনি জানেন না বলেও মতামত দেন তিনি। এবতেদায়ী শাখার শিক্ষকগণ সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা না দেয়ায়, টাকা দিয়ে হলেও ‘নূরানী’ শাখায় শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করছে কেন? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, শিক্ষার্থী বেশী থাকা বা কম থাকা সেটা আলাদা বিষয়, কিন্তু এবতেদায়ী শাখায় ৫টি শ্রেণীর জন্য ৪জন শিক্ষক। এটা কিভাবে হয়? ৫টি শ্রেণীর জন্য অন্তত ৫জন শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষার্থী না থাকলেও বা অত্যন্ত কম শিক্ষার্থী থাকলেও সরকারী কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাদী ভোগ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখানেতো কম হলেও শিক্ষার্থী আছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষার্থীই নেই, তারপরও শিক্ষকের বেতন চলছে। কথায় বলে, “নিজের দিকে না তাকিয়ে, পরের দোষটি দেখতে পাওয়া” এমনই বললেন এবতেদায়ী শাখার প্রধান মো. শামসুল হক। এবতেদায়ী শাখায় ছাত্র-ছাত্রী নেই, কিভাবে ছাত্র-ছাত্রী বেশী বা প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি করা সম্ভব হবে, একই প্রতিষ্ঠানের মাঝে আরও একটি প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে হলেও সেখানে ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে, এগুলো চিন্তাতেও নেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা শিক্ষকদের। শিক্ষার্থী না থাকলেই যেন ভালো, বেশী সময় দিয়ে হয় না বা বেশী চিন্তা ভাবনাও করতে হয় না, এটাই যেন মনের কথা, বেতন-ভাতাদী তো ঠিকমতই পাচ্ছি? জবাবদীহিতা বা বিবেকের কাছে কোন প্রশ্নও নেই যেন। সব মিলিয়ে এসব অনিয়ম ও একই প্রতিষ্ঠানের মাঝে ব্যবসায়ীক লক্ষে আরও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়টি সরজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটায় আশা করছেন এলাকার সাধারণ মানুষ ও শিক্ষানূরাগীরা। উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবরের ‘দর্পণ’ পত্রিকায় প্রতিবেদনে মোসা. আমেনা বেগমকে মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার সহকারী শিক্ষকের স্থলে শাখা প্রধান লেখা হয়েছে। এটা অনিচ্ছাকৃতভাবে লেখা হয়েছে। আসলে এবতেদায়ী শাখার প্রধান মো. শামসুল হক। এব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. তৌফিকুল ইসলাম জানান, একটি এমপিওভূক্ত এবতেদায়ী প্রতিষ্ঠানের চত্বরে বা পার্শ্বে অন্য কোন লাভজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে পারবে না। এমপিওভূক্ত কোন শিক্ষক এই লাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা পরিচালকও হতে পারবেনা। যদি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা প্রতিষ্ঠান প্রধান এধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, তবে সেটা সম্পূর্ণ বে-আইনী। কারণ এবতেদায়ী শাখার বেতন ভাতাদী সরকারী কোষাগার থেকে বহণ করা হয়, যেখানে এবতেদায়ী শাখার প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী নাই, আবার চত্বরে আরও একটি প্রতিষ্ঠান করে আর্থিক সুবিধা নেয়া মোটেই ঠিক নয়। এটা অন্যায়।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *