Sharing is caring!

ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
লোক প্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

কয়েক দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ভ্রমণসূচিতে প্রথম ছিল শিবগঞ্জের কানসাট জমিদারবাড়ি। এই জমিদারবাড়ি সম্পর্কে আমি আগেই জেনেছি আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে। এই কানসাট জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ। এর আশপাশের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির ছাদ ও দেয়াল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৮ শতাব্দীর ৯০ দশকের স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী কানসাট রাজবাড়ি। এই কানসাটের জমিদার বংশের আদি পুরুষরা আগে বগুড়া জেলার কড়ইঝাকইর গ্রামে বসবাস করতেন। সেখানে তাদের ওপর দস্যু সর্দার পরিকল্পিত অত্যাচার শুরু করে। সে কারণে তারা সেখান থেকে বাধ্য হয়ে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট নামক গ্রামে বসতি গড়ে তুলে সেখানে তারা জমিদারি প্রথা চালু করেন। এই জমিদার বংশের মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন সূর্যকান্ত, শশীকান্ত ও শীতাংশুকান্ত।
জমিদারবাড়ি থেকে বেরিয়ে ওমরপুরের সন্নিকটে অবস্থিত বাংলার প্রথম যুগের মুসলিম স্থাপত্য কীর্তির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন এক মসজিদ। এর কোনো ছাদ নেই। মসজিদটি ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহর রাজত্বকালে স্থাপিত হয়। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে মসজিদটির ছাদ ভেঙে পড়ে। মসজিদে যাওয়ার পথে রাস্তা কাঁচা। পর্যটকদের জন্য কোনো ধরনের পথনির্দেশনাও নেই। নিরিবিলি মসজিদটি তার ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদের অদূরে দেখা গেল পরিত্যক্ত কবর। গেলাম দারাসবাড়ি মাদ্রাসায়। মাদ্রাসার সামনে একটি প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের নামফলক। লেখাগুলো অস্পষ্ট। মাদ্রাসার কোনো ফটক নেই। সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন মাদ্রাসার নিদর্শন এটি, অথচ রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই।
দারাসবাড়ি মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা পথ পেরিয়ে গেলাম খানিয়াদীঘি মসজিদে। আনুমানিক ১৫ শতকে এটি নির্মিত, যা গৌড়ের প্রাচীন কীর্তিগুলোর অন্যতম। ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে কোনো এক রাজবিবি মসজিদটি নির্মাণ করেন। নামফলক মাটিতে রাখা। পর্যটকদের জন্য কোনো ধরনের নির্দেশনা নেই। কয়েকজন বৃদ্ধ একটি কাঠের বাক্স নিয়ে বসে আছেন দান গ্রহণ করার জন্য। এর পর ধুনিচক মসজিদ। প্রায় ১০ মিনিট পথ হেঁটে গ্রামের মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে পৌঁছলাম ধুনিচক মসজিদে। মেঠো পথ। পর্যটকদের জন্য কোনো সংকেত চিহ্ন নেই। কোনো স্থানে লেখা নেই মসজিদটির নাম। ধুনিচক মসজিদের পরিত্যক্ত দু’টি কবর দেখা গেল। এ মসজিদটি ১৫ শতকের শেষদিকে ইলিয়াস শাহি আমলে নির্মিত, অথচ কোথাও কিছু লেখা নেই। ধুনিচক মসজিদ থেকে বেরিয়ে গণকবরের দিকে গাড়ি এগোতে থাকল। সেখানে গিয়ে চোখে পড়ল কবরটিতে অস্পষ্ট শহীদদের নাম। তেমন কোনো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই। এরপর গেলাম সোনামসজিদ স্থলবন্দর, জিরো পয়েন্ট। দূর থেকে দেখলাম দখল দরওয়াজা, যা প্রায় ধ্বংসের পথে।
ফেরার পথে ছোট সোনামসজিদে গিয়ে দেখি সেখানকার ইতিহাসসমৃদ্ধ নামফলক পুরোপুরি অস্পষ্ট। ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন শেষে পাগলা নদীর সৌর্ন্দয দেখতে দেখতে যখন ফিরছিলাম, তখন সূর্য অস্তাচলের দিকে। ফেরার পথে প্রততত্ত¡ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ফোন দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা সম্পর্কে বর্তমান অবস্থা জানালাম। জানতে চাইলাম, কানসাট জমিদারবাড়িটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা। তিনি একবাক্যে বললেন, পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেটের অভাবে আন্তরিকতা থাকা সত্তে¡ও অনেক কাজ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে বাংলাদেশের ছয়টি জমিদারবাড়ি নিয়ে কাজ চলছে। আমি অনুরোধ করলাম, তিনি আশ্বস্ত করলেন। এরপর যোগাযোগ করলাম স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে তিনি জানালেন, এ বিষয়টি নিয়ে তারও আন্তরিকতা রয়েছে। জমিদারবাড়ির সামনের মাঠটি শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম হবে এবং জমিদারবাড়িটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে, ভাগাড়ে পরিণত হওয়া জমিদারবাড়ির ময়লা শিগগিরই সরিয়ে ফেলার জন্য। এ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকও সাংবাদিকদের সঙ্গে। যোগাযোগ রাখছেন প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের সঙ্গে। গণকবর নিয়ে যোগাযোগ করি চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে। তিনি জানান, গণকবরটি শিগগিরই সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শহরগুলো সমৃদ্ধ তখনই হয়, যখন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো স্বযতেœ সংরক্ষণ করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ তেমনই একটি সমৃদ্ধ শহর। এ শহর ছিল গৌড়ের রাজধানী। শত শত বছরের ইতিহাস এ অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেসব পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করার সময় এখনই। এ কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পুরাকীর্তির মসজিদের শহর বলে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার পিছে ফেলে আসা ইতিহাস তুলে ধরতে বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ করা জরুরি। বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ১০০ কোটি। ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এশিয়ার দেশগুলোতে ৭৫ শতাংশ পর্যটক ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোতে। ২০২৪ সালের মধ্যে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতে অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এখন প্রতি বছর ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ করে। পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল। ‘অদৃশ্য রপ্তানি পণ্য’ বলা হয় পর্যটনকে। অথচ ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগী সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৭ অনুযায়ী, ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড প্রতিষ্ঠার বয়স ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও পর্যটন নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়নি।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটন খাত নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা প্রয়োজন। সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজন। পর্যটন শিল্পের প্রসারে ভ্রমণ কেন্দ্রিক মানসম্মত ওয়েবসাইট ও পোর্টাল তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন শিল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান, বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা সহজ করলে পর্যটন শিল্প বিকাশ লাভ করবে। দিনবদলের সনদ রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পর্যটন শিল্পের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়; দেশের সব পর্যটন স্থানে ২০২১ সাল নাগাদ ২৫ লাখ পর্যটক আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকল্পে পরিপূর্ণ নিয়মনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *