Sharing is caring!

NUR HAMIMগোদাগাড়ী প্রতিনিধি \ চির নিন্দ্রায় বাবার কবরের পার্শ্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর হামিম রিজভী বীর প্রতীক। মঙ্গলবার সকাল ১০ টার সময় তার নিজ গ্রাম পিরিজপুর ফুটবল মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যদায় শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে জানাজার নামাজ শেষে তার নিজ বাড়ীর পার্শ্বে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে বাবার কবরের পার্শ্বে তার দাফন করা হয়। সেখানে জানাযা পূর্ববর্তী বক্তব্য রাখেন প্রয়াত বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভীর ছোট ভাই ও গোদাগাড়ী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অহিদুল আলম জুম্মা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার অশোক কুমার চৌধুরীসহ তার ঘনিষ্ঠজনেরা। পরে সেখানে তার দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন প্রয়াত বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভীর ফুফাতো ভাই মাওলানা আনোয়ার হোসেন। জানাযায় অংশ নিতে অজ¯্র মানুষের ঢল নামে পিরিজপুর ফুটবল মাঠে। অন্যান্যর মধ্যে অংশ নিয়েছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার খালিদ হোসেন, গোদাগাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ এসএম আবু ফরহাদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার শাহাদুল হক মাস্টার, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, উপজেলা চেয়ারম্যান ইসহাক আলী বিশ্বাস, গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু, গোদাগাড়ী পৌর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম, পৌর যুবলীগের সভাপতি অধ্যাপক আকবর আলী, উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এসএম বরজাহান আলী পিন্টু, মাটিকাটাা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, মাসাদুল গনিসহ সকল রাজনৈতিক দলের নেতা, সুধিজন ও এলাকাবাসী। প্রসঙ্গত, সোমবার বিকেলে বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভী তার রাজশাহী মহানগরীর ফুদকিপাড়ার বাড়িতে হঠাৎ বুকে ব্যাথা অনুভব করলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু পথেই ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হন একাত্তরে হার না মানা এই বীর যোদ্ধা। পরে রাত ৮টায় রাজশাহী নগরীর জিরো পয়েন্ট বড় মসজিদে তার প্রথম জানাযা শেষে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়। প্রয়াত বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভীর ছোট ভাই রমিজ উদ্দীন জানিয়েছেন, ’৭১ সালে নূর হামিম রিজভী রাজশাহী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পরিবারের সঙ্গে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় নানার বাড়িতে চলে যান তিনি। সেখানেই মায়ের কথায় তিনি ভারতের লালগোলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিখিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণে পারদর্শীতার জন্য তিনি গ্রুপ কমান্ডারের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সাবসেক্টরে। এই সেক্টরের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীনের নেতৃত্বে নূর হামিম রিজভী হিট আ্যান্ড রান গ্রুপের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেন। এর মধ্যে একাত্তরের ৭ নভেম্বর রাজশাহীর পবা উপজেলার কসবা নামক স্থানে সহযোদ্ধাদের নিয়ে নূর হামিম রিজভী পাক হানাদার বাহিনীর দুটি জীপ এবং সৈন্যদের এ্যাম্বুস ফেলে ধ্বংস করে দেন। এই দুঃসাহসিক এবং বীরত্বপূর্ণ অপারেশনের জন্য নূর হামিম রিজভীকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভীর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, দেশ স্বাধীনের পর জাতীর এই বীর সন্তান ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। রাজশাহীর অসংখ্য স্পোর্টিং ক্লাব তার গাতেই গড়া। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে নূর হামিম রিজভী রাজশাহীর প্রখ্যাত দুই সঙ্গীতজ্ঞ আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রফিক ও ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে সংগীতের তালিম নেন। অচিরেই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সূর্য শিখায়’ দীর্ঘদিন সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ১৯৮৫ সালে তিনি নিজেই পিরিজপুর গ্রামে ‘সুরসপ্তক সাংস্কৃতিক পরিষদ’ নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৭ সালের দিকে তিনি গ্রাম ছেড়ে রাজশাহী শহরে গিয়ে নগরীর ফুদকিপাড়ায় স্থায়ীভাবে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানেও তিনি ‘পারাবার সাংস্কৃতিক অঙ্গন’ নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। বীর প্রতীক নূর হামিম রিজভী বাংলাদেশ বেতারের রাজশাহী কেন্দ্রের ‘বিশেষ গ্রেডের’ একজন শিল্পীও। তিনি লিখেছেন অসংখ্য দেশত্ববোধক গান। সুর দিয়েছেন বহু আধুনিক, দেশত্ববোধক ও গণসংগীতে। তার এই মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজশাহীর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, একাত্তরের রণাঙ্গণে যেমন বীরত্ব দেখিয়েছেন নূর হামিম রিজভী তেমনি রাজশাহীর সংগীত অঙ্গনেও বীরত্ব দেখিয়েছেন তিনি। তার মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনের যে ক্ষতি হলো তা কোনোদিন পুরণ হওয়ার নয়। সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন গিয়াস তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, নুর হামিম রিজভী যুদ্ধ কালিন সময় অল্প বয়সের ছেলে হলেও খুব দুঃসাহসিক ছেলে ছিলেন। তার মৃত্যুতে আরোও গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন রাজশাহী জেলা আ.লীগের সভাপতি ও সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী এমপি, সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আমিনুল হক, প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী এ্যান্ড্রু কিশোর, গোদাগড়ী রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি মাইনুল ইসলাম ও সেক্রেটারী সফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *