Sharing is caring!

godagari phyyoto5সফিকুল ইসলাম, গোদাগাড়ী থেকে \ ‘‘এথা সর্ব্ব মহন্ত কহয়ে পরস্পরে, প্রভূর অদ্ভূত সৃষ্টি নরোত্তম দ্বারে। হেনা প্রেমময় বাদ্য কভূ না শুনিলু। এ হেনা গানের কথা কভূ না দেখিলু। নরেত্তিম কণ্ঠ ধ্বনি অমৃতের ধার। যে পিয়ে তাহার তৃষ্ণা বাড়ে অনিবার¬’’শ্রী নরোত্তম ঠাকুর মহাশয়ের কৃষ্ণলিলা কীর্তন ও গৌরচন্দ্রিকা স্মৃতি চারণে রাজশাহী চাঁপাই মহাসড়কের গোদাগাড়ী উপজেলা সদর হতে ১৫ কি.মি. দুরে বসন্তপুর (বাইপাস ) ও প্রেমতলী (ভিতরপাশ) নামক দুটি বাস ষ্ট্যান্ড থেকে ২ কি.মি. এর মধ্যে অবস্থিত খেতুর গ্রামে শনিবার থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ০৩ দিনব্যাপি বৈষ্ণব ধর্মের চুড়ামনি প্রেমভক্তি শ্রী শ্রী নরোত্তম দাসের তিরোভাব তিথি স্মরণে মহোৎসব শরু হয়েছে। প্রেমভক্তি মহারাজ, অহিংসার প্রতীক ঠাকুর নরোত্তম দাসের স্মরণে সন্ধায় শুভ অধিবাসের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানমালা শুরু। ১লা নভেম্বর রবিবার অরুণোদয় হতে অষ্ট প্রহরব্যাপি তারক ব্রম্ভনাম সংকীত্তন এবং পরদিন সোমবার প্রথম প্রহরে দধিমঙ্গল, দ্বি-প্রহরে ভোগ আরতি ও মহান্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান মালার সমাপ্তি হবে। বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীরা এই মহোৎসবে দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছে। ‘শ্রী নরোত্তম ঠাকুর মহাশয় এর সংক্ষিপ্ত জীবনী’ অনুসন্ধানে জানা যায় ১৫৩১ খ্রীষ্টাব্দে ঠাকুর নরোত্তম দাস তৎকালীন গোড়ের হাট মতান্তরে গোপাল পুর পরগণার অর্ন্তগত নির্ভীত পল্লী ও বর্তমানে গোদাগাড়ী উপজেলার গোপালপুর গ্রামে মাঘ মাসের শুক পঞ্চম তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তৎকালিন এ অঞ্চলের জমিদার রাজা শ্রী কৃষ্ণনন্দদত্ত দাস ও মাতা নারায়নী দেবী। গোপলপুরে শৈশব অতিবাহিত করে একদিন ১৬ বছর বয়সে পরিবারের সবার অল¶্যে ঠাকুর নরোত্তম দাস বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রা করেন। সেখানে শ্রীমন্মহা প্রভুর কৃপাপাত্র, অভিন্ন চৈতন্য নিগাঢ় নিতাই, নিখিল বৈষ্ণবকুল চূড়ামণি প্রেমভক্তি চন্দ্রিকার মরমি কবি, গেরানহাটি ঘরাণার প্রবর্তক, ব্রজলীলার চম্পক মঞ্জুরী, প্রভূপাদ মহাপ্রভু লোকনাথ গোস্বামীর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ ও দীক্ষা লাভ করে নবদ্বীপে যান নরোত্তম দাস। এভাবে সপ্ত গ্রাম, খড়দহ গ্রাম, নিরাচল, একচক্রা প্রভৃতি বিখ্যাত স্থানে গিয়ে বিভিন্ন গুরুর সান্নিধ্য লাভ করেন। ইতিহাস বলে, নরোত্তম দাস লোকনাথ গো¯^ামীর শিষ্য। শ্রী জীব গো¯^ামী তাঁর গুণে ও জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে তাকে “ঠাকুর মহাশয়” উপাধীতে ভূষিত করেন। একবার ঠাকুর নরোত্তম দাস শ্রীনিবাস র্আচাযের সঙ্গে হিন্দুধর্ম প্রচারে গৌড়দেশে যাত্রা করেন। পথিমধে ধর্মীয় গ্রন্থগুলো চুরি হয়ে গেলে শ্রী নিবাসরে আদেশ অনুযায়ী সন্ন্যাসী বেশে তিনি বর্তমান গোদাগাড়ীর খেতুর গ্রামে আসেন। সেখানে আসার পর নানা অকল্পনীয় কাজের আর্শ্চয সমাধানের কারণে নরোত্তমের প্রতি মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঠাকুর নরোত্তম দাস তখন নবনির্মিতি খেতুর মন্দীরে স্থাপনা গড়ে তোলেন এবং সেখানে উৎসব আয়োজেনর ব্যবস্থা করেন। শ্রীনিবাস আর্চাযরে ইচ্ছে অনুযায়ী তিনি চতুর্থদিকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠানো শুরু করেন। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করেন। ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দের কার্তীক কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে ঠাকুর নরোত্তম দাস নীত্তলীলায় প্রবেশেরে মানসে গঙ্গাস্নানের বাসনা প্রকাশ করেন। শিষ্যগণ তাকে গঙ্গাজলে নিয়ে গেলে নিজের দেহকে অর্ধনিমিজ্জিত করে প্রিয় শিষ্য গঙ্গানারায়ণ ও রামকৃষ্ণকে আদেশ করেন দেহ মার্জন করতে। গুরু আজ্ঞায় নরোত্তমরে ওই দুই শিষ্য দেহ মার্জন করতে থাকলে পুরো দেহ সাদা দুধের মতো গোড় বর্ণ ধারন করে গঙ্গাজলে মিলিত হয়ে যায়। সে অনুযায়ী ঠাকুর নরোত্তম দাস পৃথিবীতে ৮০ বছর স্থায়ী ছিলেন। এর পর থেকেই যুগ পরস্পরায় দূর্গাপূজার পর বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীরা অহিংসার এই মহান সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের কৃপা লাভের আশায় খেতুরী ধামে বার্ষিকে মিলিত হয়ে থাকেন। আর মহোৎসবকে ঘিরে মেলার আয়োজন করায় উৎসব হয়ে ওঠে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের। খেতুরী গ্রামে অবস্থতি গোরাঙ্গবাড়ী হিন্দু ধর্মের দ্বিতীয় তীর্থ স্থান বলে অনেকেই দাবি করেন। ভক্তরা শুধু গোরাঙ্গগোবাড়ী নয় তমালতলা, খিলনতলা, ভজনতলী, সহ বৈষ্ণব ধর্মের চুড়ামনি  প্রেমভক্তি শ্রী শ্রী নরোত্তম দাসের এ স্থানগুলো দর্শন করে। উপজেলা র্নিবহীর্ কর্মকতা (ইউএনও) খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, এবারের উৎসবকে ঘিরে প্রায় পাঁচ কি.মি. এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মহোৎসব ও উৎসবকে র্নিবিঘœ করতে মাঠে থাকবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাষ্ট বোর্ডের কয়েক’শ নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক  সহ আইন শৃংখলা বাহিনী। গোদাগাড়ী থানার অফিসার ইর্নচাজ (ওসি) এস এম আবু ফরহাদ জানান, খেতুরীধাম ও মেলাকে ঘিরে ঐ এলাকায় যে কোন অপ্রিতীকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে জেলা পুলিশের বিপুল পরিমান সাদা পোষাকের পুলিশ সদস্য সার্ব¶নিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া প্রেমতলী বাজারে বসানো হবে পুিলশ কন্ট্রোল রুম। এবং পুরো এলাকাকে সিসিটিভির আওয়াতায় আনা হয়েছে। বিদেশীদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি মাঠে থাকবে র‌্যাব, গোয়ন্দো পুিলশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। গৌরাঙ্গদেব ট্রাষ্ট বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল জানান, সারা পৃথিবীতে হিন্দু ধর্মাবলাম্বীদের মোট ছয়টি ধাম রয়েছে এর মধ্যে পাঁচটইি ভারত বর্ষে তার একটি মাত্র বাংলাদেশে। আর তা খেতুরীধাম। এ কারণে প্িরতবছর উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলাসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরা ও আসাম এবং নেপাল ও মায়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে খেতুরীধামে। গেল বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভক্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হয়েছিল। কিন্তু এ বছর এখনো পর্যন্ত সব কিছুঠিক থাকায় এবার ভক্তের সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করেন তিনি। গৌরাঙ্গবাড়ি মন্দিরের ব্যবস্থাপক গোবন্দি চন্দ্র পাল জানিছেন, সুন্দর পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ তিরোভাব তিথি স্মরণে মহোৎসকে ঘিরে শুরু হয়েছে গৌরাঙ্গ বাড়ী খেতুরী ধামে, বিভিন্ন বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারীদের প্যান্ডেল তৈরী, দোকান পাট বসানোর কাজ। পাশাপাশি শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গদেব ট্রাষ্ট বোর্ড এর সদস্যরা ভক্তদের সেবা দানের জন্য পানি, টয়লেট, বিদ্যুৎ, থাকার জায়গা, খাওয়ার ব্যাবস্থা করতে ব্যাস্ত সময় কাটাছে। উপজেলা প্রশাসন বৈষ্ণবকুলচুড়ামনি নরোত্তম দাসের এ মহোৎসবকে ঘিরে কঠোর নিরাপ্তার ব্যাবস্থা নিয়েছে। নিরাপ্তার অংশ হিসাবে খেতুরী ধামে সিসি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেকরার দিয়ে গেটে চেক, প্রবেশের জন্য ২ টি গেট ব্যাবহার করা হবে, ভ্রাম্যমান আদালত সার্বক্ষিন কাজ করবে, পুলিশ, আনসার, সেচ্ছাসেবক দল ও র‌্যাবের দল সব সময় নিরাপ্তার দায়িত্বে থাকবে। এছাড়াও বিদেশী ভক্তদের জন্য থাকবে আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। এদিকে রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়কে আগত ভক্তদের জন্য নিরাপ্তার ব্যাবস্থা নেওয়া হয়েছে। খেতুরী ধামের আশে পার্শ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ভক্তদের থাকার জন্য ৩ দিনের ছুঠি ঘোষনা করা হয়েছে। রাস্তা গুলোর দু-ধারে আলোর জন্য বিদ্যুৎ এর বাতি দেওয়া হয়েছে। শ্রী নরোত্তম দাস  মহাশয়ের তিরোভাব তিথি স্মরণে মহোৎসবে প্রায় ১১ টি দেশের বৈষ্ণব ধর্মের লক্ষ লক্ষ ভক্তরা আসে লাখ লাখ নারী-পুরুষ ভক্তের জন্য প্রয়োজনীয় প্রসাদ, বিশুদ্ধ পানি ও ¯^াস্থ্য সম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া যাতায়াত র্নিবিঘœ করতে প্রেমতেলী বাজার থেকে খেতুরীধাম পর্যন্ত প্রায় তিন কি.মি. সংযোগ সড়কটিতে আলোক সজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *