Sharing is caring!

গোদাগাড়ীতে শ্রাবনেও অনাবৃষ্টি :

আমন আবাদ নিয়ে বিপাকে কৃষক

♦ সফিকুল ইসলাম, গোদাগাড়ী

আষাঢ় গেল বৃষ্টিতে, শ্রাবণ এলো, কিন্তু কাংক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে আমন আবাদ নিয়ে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। ঋতুচক্রে এ দুই মাস বর্ষাকাল। এসময় সারা দেশের মতো গোদাগাড়ীতেও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। চারদিকে পানিতে থই থই করে মাঠঘাট। কিন্ত জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির পানির দেখা নেই এই শ্রাবণে। ছিটেফোটা পানিতে কোনো মতে একটি চাষ দিয়ে আর চাষ দিতে পারছেন না চাষিরা। ফলে বৃষ্টির পানির আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন চাষিকুল। কখন নামবে আকাশ থেকে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি আর ধুম পড়বে আমন রোপণের। তবে এরই মধ্যে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ গভীর নলকুপ (সেচযন্ত্র) হতে বেশি দরে পানি কিনে আমন চাষ শুরু করেছেন। গত রোববার সকালে উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায় মাঠের পর মাঠ চাষ করা জমি পড়ে রয়েছে। আবার যাদের জমি জলাশয় বা পুকুরের ধারে তারা শ্যালোমেশিন দিয়ে জমি চাষ করে কোনো মতে রোপণ করেছেন ধানের চারা। আবার অনেক জমিতে একটি চাষ দেবার পর পানির অভাবে চাষ তো দ‚রের কথা, চাষ করা জমি ফেটে চৌচির হচ্ছে। অনেক চাষি চরম চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। আশানুরূপ বৃষ্টির না হলে হয়তো আমনের চারা লাগানো হবে না জমিতে। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে সেচের উপর ভরসা করা শুরু করেছেন। এদিকে আমনের বীজতলার সময় পার হয়ে পড়ছে। বীজতলার বয়স হয়ে গেলে রোপণ করলেও ফলন আশানরুপ হবে না। এক মহা দুঃশ্চিন্তায় দিন পার করছেন কৃষকরা। গোদাগাড়ীতে আমনের চাষাবাদ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে হয়। উপজেলার বেশকিছু এলাকায় রয়েছে উঁচু জমি। আর এসব জমিতে চাষের একমাত্র ভরসা বৃষ্টির পানি। উপজেলার শত শত চাষির ভরসা আমন চাষে। তারা দীর্ঘদিন ধরে আমন রোপণের জন্য প্রস্তুতি নিলেও পানির অভাবে রোপণ করতে পারছেন না। এদিকে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এর গভীর নলক‚পগুলোর আওতাধীন জমিগুলোতে হাহাকার অবস্থা পানির জন্য। সেখানেও রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও ভোগান্তি। এব্যাপারে রিশিকুল ইউনিয়নের ভানপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, বর্ষাকালেও আকাশে তেমন বৃষ্টি না থাকায় গভীর নলক‚প থেকে আমন ধান চাষের জন্য বীজতলা তৈরি করলেও পানির অভাববে তা রোপন করা সম্ভব হচ্ছে না। আষাঢ় মাসের শেষের দিকে একটি বড় বৃষ্টি হলেও অনেক কৃষক ট্রাক্টর, ট্রলি দিয়ে জমি চাষাবাদ শুরু করে। কিন্ত এ পর্যন্ত আর বৃষ্টি না হওয়ায় চাষাবাদ করা জমিগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে চৈচির হয়ে ফেঁটে গেছে। কৃষকরা জমি লাগাতে পারছেনা। একদিকে বাজারে ধানের দাম কম, অন্যদিকে অনাবৃষ্টি এই নিয়ে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছে। কৃষক সৈয়বুর রহমান জানান, কোনো মতে নিজের জমি রোপণ করতে পেরেছি। কিন্ত পানির দেখা না পাওয়ায় চরম শঙ্কায় আছি। দু-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টির পানির দেখা না পেলে হয়তো রোপণকৃত জমি মরে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। রাকিব নামের আরেক চাষি জানান, আমন রোপণ হয় বৃষ্টির পানিতে এবং উত্তোলন পর্যন্ত বৃষ্টির পানিই ভরসা। এজন্য চাষে সেচ খরচ বাঁচা যায়। ফলে আমন চাষ করে লাভও পাওয়া যায় ভালোই। কিন্ত এবারে চিত্র পুরোটাই উল্টো। এখন পর্যন্ত জমি রোপণের মতো বৃষ্টির পানির দেখা নেই। জানি না বৃষ্টির পানির দেখা পাওয়া যাবে কিনা। যাদের জমি মিনি মর্টারের আওতায় তারা অতিরিক্ত খরচে সেচ দিয়ে জমি রোপণ করছেন। বিগত বছরগুলোতে এসময় এতোই পরিমাণ বৃষ্টি হতো খাল বিল জমিতে পানিতে থই থই করত। এমন কি বৃষ্টির স্রোতে নিচু এলাকার জমির ধান ভেসে যেত। কিন্ত এবার আষাঢ় মাস পার হয়ে শ্রাবণ এলেও বৃষ্টির দেখা না থাকলেও খরতাপ ও ভ্যাপসা গরমে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। কৃষক রাকিব জানান, ১২ বিঘা জমিতে আমন রোপণের জন্য গত প্রায় ১৫ দিন আগে চাষ দিয়েছি। কিন্ত বৃষ্টির পানি না হওয়ার কারণে পুনরায় চাষ দেয়া যাচ্ছে না। অনাবৃষ্টির কারণে আমন ধান চাষ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা।তার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ধর্ণা দিয়ে বরেন্দ্র বহুমূখীর গভীর নলক‚প গুলোতে পানি না পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। উপজেলার গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পাকড়ী, রিশিকুল, দেওপাড়া, মাটিকাটা, বাসুদেবপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও কাকনহাট পৌর এলাকার আমন ধান চাষীরা আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে গভীর নলক‚পগুলো থেকে আমনের বীজতলা তৈরী করলেও পানির অভাবে তা রোপন করতে পারছেনা। অন্যদিকে, যেখানে বরেন্দ্র বহুমুখী (বিএমডিএ)’র গভীর নলক‚প আওতাধীন জমি রয়েছে, সেখানেও চরম ভোগান্তি। যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে গভীর নলক‚প গুলো নষ্ট হলে সাথে সাথে দেখা মিলছে না বি.এম.ডি.এ এর মেকানিকদের। ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রæটি দেখা দিলেও মেকানিকদেরকে দিতে হচ্ছে তাদের মনমতো অর্থ। বি.এম.ডি.এ এর গভীর নলক‚প সেবা বাদ দিয়ে করছে কৃষদের সাথে ব্যবসা। যান্ত্রিক ত্রæটি হলে এর দায়ভার কৃষক বহন করবে কেন। কারণ কৃষকরা তো অর্থের বিনিময়ে পানি নিয়ে থাকে। অন্যদিকে বিএমডিএ এর মেকানিকরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। তাদের কথামতো আদান প্রদান না হলে মেলে না তাদের নিকট কোন সেবা। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপ¶ রাজশাহী গোদাগাড়ী জোন-১ এর সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ জিল্লুল বারীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গোদাগাড়ী-১ জোনে রয়েছে ৩ শত ৮৪টি ও কাকনহাট জোন-২ এর রয়েছে ৩ শত ১৪টি গভীর নলক‚প। সেখানে আমাদের মেকানিকের সংখ্যা গোদাগাড়ী-১ জোনে ৫ জন। জনবল কম থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবে কোন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বা কোন কিছু মেরামতের কারণে বি.এম.ডি.এ কর্তৃপক্ষকে কোন প্রকার অর্থ প্রদান করার প্রয়োজন নাই কৃষকদের। তবে, কেউ ব্যক্তিগত নিলে, সেটা অনিয়ম। বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ নীতিমালায় যেসমস্ত তালিকা রয়েছে আমরা তা নিয়মিত ভাবে পালন করছি। তবে কোন গভীর নলক‚প অপারেটর কৃষকদেরকে ছয় নয় বুঝিয়ে বি.এম.ডি.এ এর নাম ভাঙ্গিয়ে অর্থ আদায় করে থাকলে এবং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আমরা তাৎ¶নিক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মতিয়ুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গোদাগাড়ীতে আউশ ধানের ১২ হাজার ৫০ ও আমন ধানের ২৩ হাজার ৭ শত ৪৬ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে থেকে কৃষকদেরকে সুপরামর্শ দিতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষনিক কৃষকদের সাথে মাঠে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। বৃষ্টি হলে বা সেচ সুবিধা পেলে আমাদের আমনের লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হবে বা তার চেয়ে বেশি অর্জন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ আকাশের বৃষ্টি কম হলেও শ্রাবণ মাসটি পুরোটায় বৃষ্টির মাস, তাই এখনও অনাবৃষ্টি বলা যাবে না। চলতি মাসে ব্যাপক বৃষ্টি হতে পারে। তাই উপজেলার কৃষকদের চিন্তিত না হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *