Sharing is caring!

গ্রামীণ ট্রাভেলস্’র মালিকের ভূমিহীনদের উপর অত্যাচার ॥ বাদ যায়নি নারীও ॥ আদালতে মামলা-জেলা প্রশাসনে অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোখলেসুর বাহিনীর অত্যাচারে সরকারি জমি ছেড়ে পালাচ্ছে ভূমিহীন পরিবারগুলো

♦ স্টাফ রিপোর্টার

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মুখোষধারী সমাজ সেবক জোসনা অটোর রাইস মিলের স্বত্তাধিকারী ও গ্রামীন ট্রাভেলস্ এর মালিক মো. মোখলেসুর রহমান ও তাঁর বাহিনীর অত্যাচারে সরকারী জমি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের জামতাড়া এলাকার নওহাট্টা মৌজার বেশকিছু ভূমিহিন পরিবার। অত্যাচার চালিয়েছে নারীদের উপরও এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধীকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকীও। ভূমিহীন বসবাসকারী নারীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং পুরুষদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। ২০০৬ সাল থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বসবাস করা প্রায় ৩০টি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশ পরিবারই মোখলেসুর বাহিনীর অত্যাচারে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। সরকারী তত্ত্বাবধানের জমিতে বাস করলেও মোখলেসুর বাহিনীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেশীর ভাগ পরিবার চলে গিয়ে কোন রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছে বিভিন্ন স্থানে। অবশিষ্ট আছে কয়েকটি পরিবার। সরকারী দপ্তর ও আদালতে মামলা সুত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের জামতাড়া এলাকার নওহাট্টা মৌজায় অবস্থিত প্রায় ৪ একর জমিসহ সি.এস থেকে আর.এস রেকর্ড পর্যন্ত প্রাক্তন জমিদারদের বেশকিছু সম্পত্তি সরকারী খাস দখলীয় সম্পত্তি হিসেবে সরকারী দখলে থাকে। বর্তমান আর.এস রেকর্ড ভেষ্টেড এন্ড নন রেসিডেন্ট সম্পত্তি পক্ষে বাংলাদেশ সরকার হিসেবে রেকর্ড রয়েছে। অবনী মোহন মৈত্র দিং নামক জমিদার গণের জমি অনুরুপ রেকর্ড হলে তাদের প্রায় ১০০ একরের উর্ধ্বে জমি বিগত জেলা প্রশাসক ২০০২ সালে ৯২(ক) ধারা মোতাবেক খাস ঘোষণা করেন। যা অদ্যবধি বহাল রয়েছে। রেকর্ডীয় ভূমি মালিকরা তাঁদেরই বংশধর ছিলেন। এই খাস জমিতে প্রথমে কয়েকটি ভূমিহীন পরিবার বসবাস শুরু করলে ধীরে ধীরে প্রায় ৩০টি ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার খাস জমির উপর বসবাস করে আসছিলো। হঠাৎ করেই এই খাস জমির উপর নজর পড়ে এলাকার জমি জালিয়াত চক্রের হোতা সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার মৃত পিয়ার বিশ^াসের ছেলে মো. আব্দুল হামিদ ও একই এলাকার মৃত সাইদুর রহমানের ছেলে মো. নজরুল ইসলামের। ১৯৯৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে ভূয়া জমির মালিক সাজিয়ে এবং ভূয়া কাগজপত্র দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর জনৈক ২ জন আইনজীবীর নামে একটি আমমোক্তারনামা দলিল সৃষ্টি করা হয়। বিগত ২০১৪ সালে এ্যাডভোকেট পূর্ণিমা ভট্টাচার্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর খারিজ ও হোল্ডিং চালুর জন্য আবেদন করেন। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্তকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কাগজপত্র যাচায়-বাছায় করে সংশ্লিষ্ট জমির কাগজপত্রে কোন মিল না থাকায় আবেদনটি নাকচ করেন। জমি খারিজে ও হোল্ডিং চালু করতে ব্যর্থ হয়ে আবার নতুন কৌশল করে ২০১৬ সালে সাজানো কাগজপত্র দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে জমি জালিয়াত চক্রের হোতা সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার মৃত পিয়ার বিশ^াসের ছেলে মো. আব্দুল হামিদ ও একই এলাকার মৃত সাইদুর রহমানের ছেলে মো. নজরুল ইসলামের নাম বরাবরে আমমোক্তার প্রতিনিধি এ্যাড. পূর্ণিমা ভট্টাচার্য রাজশাহী সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের ২০০৮ সালের (১১২৪১ নম্বর) এর দলিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংশ্লিষ্ট জমির তফসীল না থাকা জমির কাগজ দিয়ে একটি আমমোক্তারনামা দলিলের নম্বর সুত্রে একটি খোষকবলা দলিল সম্পাদন করে দেন। সেই দলিল দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে খারিজ ও হোল্ডিং চালুর জন্য আবেদন করে আবারও ২০১৯ সালে আব্দুল হামিদ ও মো. নজরুল। কাগজপত্র মিল না থাকায় ২০১৪ সালে খারিজ আবেদন নাকচ হলেও অজ্ঞাত কারণে ও সুবিধাভোগ করে জালিয়াত চক্রের সাথে যোগসাজস করে বর্তমান ঝিলিম ইউনিয়ন ভূমি কর্তকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম জালিয়াত চক্রের পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেন সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উক্ত জমিগুলো খারিজ অনুমোদন দেন সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা। পরবর্তীতে ওই জমির মধ্য থেকে প্রায় ২ একর জমি আব্দুল হামিদ ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে ক্রয় করে জামতাড়া এলাকার জোসনারা অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী ও গ্রামীণ ট্রাভেলস্ এর মালিক আলহাজ¦ মো. মোখলেসুর রহমান। তিনিও একইভাবে জমিগুলো খারিজ ও হোল্ডিং চালু করেন। কিছুদিন পর থেকেই শুরু করে ওই জমিতে দীর্ঘদিন থেকে বসবাসকারী ভূমিহীন পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা পরিকল্পনা। এক এক সময়, এক এক রকমের ফন্দি করা হয় তাঁর মিলের কর্মচারীদের দিয়ে। শেষ পর্যন্ত মোখলেসুর রহমান নিজে ও তাঁর ভাই মো. মইদুল ইসলাম নিজেরাই লোকজন নিয়ে ভূমিহীন পরিবারগুলো উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে নেমে পড়ে এবং প্রকাশ্যে হুমকী-ধামকী দেয়া শুরু করে। আব্দুল হামিদ ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে নেয়া জমির উপর ভূমিহীন পরিবারের বসবাসা করার কথা জেনে-শুনেও ওই জমি ক্রয় করে আলহাজ¦ মোখলেসুর রহমান। ভূমিহীন পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ না করতে পারলেও কেনা জমির দখল বুঝিয়ে দিতে আব্দুল হামিদ বা নজরুল ইসলামকে না বলে উল্টো ভূমিহীনদের উপরই নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে মোখলেসুর, তাঁর ভাই ও মিলের লোকজন। কিন্তু ভূমিহীন পরিবারগুলোর কোন উপায়ান্তর না থাকায় নির্যাতন সহ্য করেই বাস করতে থাকে অনেকটাই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই। শেষ পর্যন্ত ওই খাস জমিতে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করতে অবৈধ হলেও জোরপূর্বক জমি ক্রয়ের কথা বলে জমি ছেড়ে চলে যেতে নানা রকমের ফন্দি ও হুমকী-ধামকী দেয়া অব্যহত রাখে। কিছু পরিবার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অন্যত্র চলেও যায়। একান্তই নিরুপায় হয়ে এবং তাদের হুমকী ও অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ওই জমিতে বাস করা ২০টি পরিবার একত্র হয়ে প্রতিকার চেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবছর মার্চ মাসে মামলা দায়ের করে ভূক্তভোগী পরিবারগুলো। মামলা নম্বর-৫৭/২০২০অঃপ্রঃ। মামলার পরে আবারও নতুন করে চতুর মোখলেসুর রহমান ষড়যন্ত্র শুরু করে। পরিবারগুলোকে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে এবং হয়রানীর ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক লিখিত অঙ্গীকার নামা লিখে নেয়। ফলে সেখান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় কিছু পরিবার। মোখলেসুর বাহিনীর অমানবিক নির্যাতনের পরও সেখানে বাস করা কিছু পরিবার তাঁর কথায় রাজি না হওয়ায় তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় মোখলেসুর রহমানের ভাই নিজে ও জোসনা অটো রাইস মিলের কর্মচারীদের দিয়ে। তারপরও তাঁর কথায় রাজি না হওয়া পরিবারগুলো নির্যাতন সহ্য করে ওই জমিতেই বাস করছে অদ্যবধি। এজন্যই প্রতিনিয়তই নির্যাতনের ধরণ ও মাত্রা বাড়ছে। মিলের পাশর্^বর্তী অন্যের জমি দিয়েও চলাফেরা করতে গেলেও গালিগালাজ করছে মোখলেসুর রহমানের ভাই ও বাহিনীর লোকজন। করোনাকালে যখন সারা বিশে^র সাথে বাংলাদেশের মানুষও আতংকিত ও অহসায়ত্ব বোধ করছিলো। সেই সংকটময় সময়ের মধেই এপ্রিল/২০ মাসেই একপর্যায়ের তারা ওই সরকারী জমিগুলো নিজেদের দখলে নেয়ার নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। কথা না মানায় সরকারী জমির অনেকাংশই তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ওই পরিবারের পানি ব্যবহারসহ চলাফেরা বন্ধ করে দেয় এবং বিভিন্ন কৌশল শুরু করে অবিশষ্ট পরিবারগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে সরকারী জমিগুলো নিজ দখলে নিয়ে মিলের জমির সাথে একত্র করে নেয়ার চেষ্টা করে। এভাবেই কেটে গেছে কয়েক মাস। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে গত ০৫ আগষ্ট সরকারী তত্ত্বাবধানের সম্পত্তি জমি জালিয়াত চক্রের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষে ভূক্তভোগী মো. আব্দুল মালেক। অভিযোগ দায়েরের খবর পেয়ে মোখলেসুর, তার ভাই ও বাহিনীর লোকজন আরও বেপরোয়াভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। লিখিত অভিযোগকারী ভূক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে মইদুল ও মহবুলের উপর চড়াও হয় পরের দিনই। ডেকে নিয়ে হুমকী দেয় ওই জমি ছেড়ে চলে যেতে। অন্যথায় হাত-পা ভেঙ্গে পুকুরে ডুবিয়ে মেরে ফেলা হবে বলেও হুমকী দেয়। সেখানে বাসকরা অসহায় পরিবারের নারীদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং নানাভাবে হুমকী দিতে থাকে। অভিযোগের ৩দিন পর অভিযোগকারী আব্দুল মালেকের ছেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মো. সজিব (২০) ওই এলাকার অন্যের জমিতে ঘাষ কাটছিলো। দুপুরের দিকে মানষিক প্রতিবন্ধী সজিব কে ডেকে নিয়ে বেধড়ক তাকে মারধর করে এবং গলায় হাসুয়া ধরে কেটে ফেলার হুমকী দিয়ে ছেড়ে দেয়। ওইদিনই বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জরুরী বিভাগে ভর্তি করা হয় সজিবকে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সজিবকে বাড়িতে নিয়ে যায় আব্দুল মালেকের স্ত্রী ও অন্যান্যরা। বিজ্ঞ আদালতে সার্বিক বিষয় নজরে আনেন মামলার আইনজীবী সৈয়দ তৌহিদুজ্জামান। সবকিছু বিবেচনায় এনে বিজ্ঞ আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের নওহাট্টা মৌজার সাবেক জেলা-রাজশাহী, হাল জেলা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ, থানা নবাবগঞ্জ সদর, জে.এল নং-৮৪, আর.এস খতিয়ান নং-০৪, আর.এস দাগ নং-১৩২, ১৫৩ ও ১৮১। জমির পরিমান-.৯৬ একর। এব্যাপারে নজরুল ইসলামের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বৈধ কাগজপত্র দেখেই জমি ক্রয় করেছি এবং বৈধভাবেই জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কাগজপত্রে কোন ত্রুটি নেই। অবৈধভাবে সরকারী জমি কিনে দখল ও ভূমিহীনদের অত্যাচার ও উচ্ছেদের বিষয়ে বিজ্ঞ আদালতে মামলা হওয়ার পর বিষয়টি মোখলেসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ‘দর্পণ’ প্রতিবেদকের কাছে কিছুদিন সময় চেয়ে ওই জমিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে যথাযথভাবে অন্যত্র জমি ক্রয় ও ঘর-বাড়ি নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার আশ^াস দিয়ে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু উল্টো এঘটনা সাংবাদিককে জানার জন্য আরও ক্ষুদ্ধ হন এবং নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তিনি আশ^াসের বানী শোনালেও শেষ পর্যন্ত ভূমিহীন পরিবারের নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীর উপর অত্যাচার অব্যাহত রাখেন। বিষয়টির সরজমিন ও সুষ্ঠু তদন্ত করে নামধারী সমাজ সেবক মোখলেসুর ও তাঁর বাহিনীর অত্যাচার থেকে রক্ষায় ও ভূমিহীন পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই রক্ষায় প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেবেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর এমনটাই আশা করছেন ভূক্তভোগী ও নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যরা ও জেলার সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *