Sharing is caring!

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃতি সন্তান নাট্যকার

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ

আর নেই

♦ স্টাফ রিপোর্টার

একুশে পদক প্রাপ্ত প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃতি সন্তান অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ আর নেই। তিনি রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে রোববার বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বেশ কয়েক দিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে রাখার পরামর্শ দেন। এর আগে তিনি একাধিকবার লাইফসাপোর্ট থেকে ফিরে এসেছিলেন। তবে এবার আর ফেরা হয়নি। মৃত্যুতালে তিনি স্ত্রী ও ৪ ছেলে সন্তান ডা. তিতাস মাহমুদ, তমাল মাহমুদ, তিয়াসা আহমেদ ও তাহিতি আহমেদসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ওই দিন রাতে রাজধানীর মিরপুর রূপনগরে তাঁর বাসভবনসংলগ্ন মদিনা মসজিদে বাদ এশা প্রথম জানাজা হয়। এরপর মরদেহ ফ্রিজিং ভ্যানে তাঁর বাসভবনের সামনে রাখা হয়। সেখানে থেকেই সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হয়। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিলসহ অন্যান্যরা। শ্রদ্ধা জানাতে ও জানাজায় এসেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান ও সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, নাট্যকার অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী, উদীচীর সহ-সভাপতি শংকর সাঁওজাল, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, রহমত আলী, অভিনেতা কে এস ফিরোজ, খায়রুল আলম সবুজ, সালাউদ্দিন লাভলুসহ সংস্কৃতিমনা বিশিষ্ট জনেরা। জানাজা শেষে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, মমতাজউদদীন আহমদ ছিলেন দেশের নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ। মঞ্চনাটক রচনায় তিনি অন্যতম পথপ্রদর্শক। মঞ্চনাটক রচনায় যে পথ তিনি দেখিয়েছেন, তা দেশের নাট্যাঙ্গন অনুসরণ করবে, অনুকরণ করবে। পারিবারিক সিধান্ত অনুযায়ী তাঁর ইচ্ছাতেই তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার বজরাটেক সবজা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ৩য় জানাযা শেষে গ্রামের বাড়িতে বাবার কবরের পাশে চিরশায়িত করা হবে। ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজউদদীন আহমদ। তাঁর বাবা কলিমুদ্দিন আহমদ ও মা সখিনা বেগম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে তিনি রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। সেই সময় রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদকে। তিনি ৩২ বছরের বেশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় নাট্যকলায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খন্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৭৬-৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৭৭-৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মমতাজউদদীন আহমদ শিক্ষক ও লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেও মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মী হিসেবে সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর লেখা নাটক ‘কি চাহ শক্সখ চিল’ ও ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মমতাজউদদীন আহমদের লেখা জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বিবাহ’, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘বর্ণচোরা’, ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’, ‘রাজা অনুস্বরের পালা’, ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’, ‘সুখী মানুষ’, ‘রাজার পালা’, ‘সেয়ানে সেয়ানে’, ‘কেস’, ‘ভোটরঙ্গ’, ‘উল্টো পুরান’, ‘ভেবে দেখা’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তাঁর বেশ কিছু নাটক বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শতাধিক বই লিখেছিলেন মমতাজউদদীন আহমদ। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত’, ‘প্রসঙ্গ বাংলাদেশ’, ‘প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু’, ‘আমার ভেতরে আমি’, ‘জগতের যত মহাকাব্য’, ‘মহানামা কাব্যের গদ্য রূপ’, ‘সাহসী অথচ সাহস্য’, ‘নেকাবী এবং অন্যগণ’, ‘সজল তোমার ঠিকানা’, ‘এক যে জোড়া, এক যে মধুমতি’, ‘অন্ধকার নয় আলোর দিকে’। সর্বশেষ ১ জুন বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশ পায় তাঁর সর্বশেষ বই ‘আমার প্রিয় শেক্সপিয়ার’। ১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন মমতাজউদদীন আহমদ। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ সম্মাননা, শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, আলাউল সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *