Sharing is caring!

ভূয়া চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টারে সোখিনার পেটে গজ রেখে সেলাই

♦ স্টাফ রিপোর্টার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ ভূয়া চিকিৎসক দিয়ে ভুল অপারেশনে সোখিনা নামের এক প্রসূতীর পেটে গজ রেখে সেলাই দেয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন রোগী ও রোগীর পরিবার। সিজার অপারেশনের পর পেটের মধ্যে ‘গজ’ রেখেই অপারেশন শেষ করায় চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে রোগী। রোগীর জীবন বাঁচানোই যেন দায় হয়ে পড়েছে। অবশেষে আবারও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে পেট থেকে ‘গজ’ বের করা হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধিন অবস্থায় রামেক হাসপাতালে ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে বেডে কাতরাচ্ছেন রোগী সোখিনা বেগম (৩৫)। এছাড়াও অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষাসহ সেন্টারের কার্যক্রম চালানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এঘটনার শিকার সোখিনা বেগম জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তী ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের মো. তোহরুল ইসামের স্ত্রী। তোহরুল ইসলাম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। সোখিনা একই উপজেলার ধাইনগর ইউনিয়নের রানীনগর গ্রামের সামশুদ্দিনের মেয়ে। ভুক্তভোগীর স্বামী সুত্রে জানা গেছে, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তী ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের মো. তোহরুল ইসামের স্ত্রী সোখিনা বেগম সন্তান সম্ভবা। গত ১১ নভেম্বর বিকেলে সোখিনার সন্তান প্রসব যন্ত্রণা হলে স্বামী ও পরিবারের লোকজন শিবগঞ্জ পৌর এলাকার ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ নিয়ে যায়। যদিও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের কাগজপত্রে লেখা রয়েছে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ হাসপাতাল’। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার পর সেন্টারের ডা. কামাল উদ্দিন নামের ভূয়া চিকিৎসক সিজার অপারেশন করেন। সোখিনার একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ১৪ নভেম্বর সোখিনাকে সেন্টার থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ কর্তৃপক্ষ নওদাপাড়াস্থ রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর ডা. কামাল উদ্দিন নামের চিকিৎসক সিজার অপারেশন করার কথা বললেও, খোজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. কামাল উদ্দিন নামের কোন চিকিৎসক নওদাপাড়াস্থ রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেই বলে জানা গেছে। এঘটনায় অনেকেরই ধারণা, নিজেদের বাঁচাতে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ কর্তৃপক্ষ ওই চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করতেও পারে। তবে সেন্টারের দেয়া ডা. কামাল নামের চিকিৎসকের বিষয়ে খোজ নিলেও মেলেনি চিকিৎসকের সঠিক পরিচয়। কয়েকদিন পর থেকেই সাখিনার পেটে ব্যাথা শুরু হয়। ক্রমশ ব্যাথা বাড়তে থাকায় আবারও ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ নিয়ে যায় রোগী সোখিনাকে। সেখানে ‘আলট্রাশনোগ্রাম’ করে। কিন্তু সেন্টারের চিকিৎসক কোন রোগ নির্ধারণ করতে না পারলেও আবারও নতুন করে ঔষধ লিখে দেন। কয়েকদিনে মধ্যেই ব্যাথা সেরে যাওয়ার কথা বললেও ব্যাথা না কমে আরও বাড়তে থাকে এবং পেট ফুলতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে পুণরায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ নিয়ে যায় পরিবারের লোকজন। আবারও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অপারেশনের প্রস্তাব দিলে রোগীর স্বজনরা ওই সেন্টারে অপারেশন না করে রোগীকে অবশেষে গত ৬ ডিসেম্বর রামেক হাসপাতালে ভর্তি করে। ইতিমধ্যেই সোখিনার দেহ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং উৎকট দূর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক দ্রæত সোখিনার আলট্রাশনোগ্রাফী করলে রিপোর্টে সোখিনার পেটের মধ্যে ‘গজ’ (অপারেশন সামগ্রী) রয়েছে বলে নিশ্চিত হন। গত ৮ ডিসেম্বর বিকেলে অপারেশনের ব্যবস্থা করে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অপারেশনে সোখিনার পেট থেকে প্রায় দেড় ফুট ‘গজ’ বের হয়। এঘটনায় রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ রোগীর স্বজন ও সচেতন মহলের মাঝে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এব্যাপারে রোগীর স্বামী তোহরুল ইসলাম সীজারিয়ান অপারেশনের পর রোগীর জীবন সংকটাপন্ন জানিয়ে বলেন, এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা বা তামাসা করা শিবগঞ্জের ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এর মালিক, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও অন্যান্যদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমরা গ্রামের সহজ সরল মানুষদের সাথে সেন্টারের লোকজন চিকিৎসার নামে প্রতারণা বা অত্যাচার চালাচ্ছে। আল্লাহ’র রহমতে সোখিনা কোনমতে বেঁচে রয়েছে। কিন্তু আর কোন মানুষ যেন এভাবে চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ওই সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শারিরীক প্রতিবন্ধী তোহরুল ইসলাম। এব্যাপারে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এর পরিচালক নূর নবীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে কেউই ফোন রিসিভ করেন নি। চাঞ্চল্যকর এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাক্তার সাইফুল ফেরদৌস খায়রুল ইসলাম আতাতুর্ক। তিনি বলেন, শিবগঞ্জের ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ সোখিনা নামের এক রোগীর সিজার অপারেশনে ভূল করে পেটের মধ্যে গজ রেখে সেলাই করে দেয়। পরে ৮ ডিসেম্বর রামেক হাসপাতালে পুনরায় অপারেশন করলে সোখিনার পেট থেকে গজ পাওয়া যায়। এব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী প্রতিবেদককে বলেন, ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এ সোখিনা নামের এক রোগীর সিজার অপারেশনে ভুল করে পেটের মধ্যে ‘গজ’ থেকে যায়। পরে রামেক হাসপাতালে পুনরায় অপারেশনে সোখিনার পেট থেকে গজ বের হয়। এঘটনায় সোখিনার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এর কোন অনুমোদন না থাকা বিষয়ে প্রতিবেদকের প্রশ্নে সিভিল সার্জন বলেন, প্রাথমিকভাবে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ এর অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলছে, সেটা তদন্ত শেষে বলা যাবে। তদন্তে অবৈধ প্রমানিত হলে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ সিলগালা করে দেয়া হবে। ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে ‘সিটি শাহনেয়ামতুল্লাহ ডায়াগোনিষ্ট সেন্টার’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটায় আশা করছেন ভূক্তভোগী পরিবার, এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *