Sharing is caring!

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আইপিএলের বাজিতে

ধ্বংসের পথে যুবসমাজ

♦ মো. জাহাঙ্গীর আলম

ক্রিকেট মানেই যুব সমাজের মাঝে নানা আনন্দ, কিন্তু এরই মধ্য দিয়ে সমাজের তরুণদের মাঝেও চলছে রমরমা বাজি বাণিজ্য। তার সূত্র ধরে ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের গায়ে জুয়ার কলঙ্ক লেগেছে অনেক আগেই। ম্যাচ গড়াপেটা কিংবা স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে ক্যারিয়ার বরবাদ হয়েছে অনেক খেলোয়াড়ের। তবে আড়ালের সর্বগ্রাসী সেই বাণিজ্য কেবল খেলোয়াড় বা কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাতে জড়িয়েছে দর্শকরাও। তার জ্বরে এখন পুড়ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দর্শকরাও। যে টূর্ণামেন্ট ঘিরে জুয়ার এই উন্মাদনা চলছে, তার নাম ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভারতীয় এই আসর ঘিরে জুয়াড়িদের মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব কিংবা অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও প্রকাশ্যেই চলে এই জুয়া। আর তার ফাঁদে পড়ে রাতারাতি নিঃস্ব হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীরা। গত মঙ্গলবার রাতের এক ঘটনা। সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের পলশা গ্রামের একটি চায়ের দোকানের টেলিভিশনে আইপিএলের খেলা চলছিল। দিল্লি ক্যাপিটালস বনাম সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ম্যাচ। বলে বলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছিল দোকান ঘিরে বসে থাকা দর্শকদের মধ্যে। কারণ একের পর এক বাজি চলছিল। খেলা চলা অবস্থায়ই একজন বলে উঠল, ‘এই বলে ওয়ার্নারের চার হবে। ২০ টাকা। কে আছে?’ আরেকজন বলল, ‘চার হবে না। ঠিক আছে ২০।’ আরেকজন বলল, ‘ওয়ার্নার আউট। ৫০ টাকা, কেউ আছে? ঠিক আছে দুজনের সাথেই…।’ বোলার কাসিগো রাবাদার পরবর্তী বলে হলো এক রান। সঙ্গে সঙ্গে বাজি ধরা দুই ব্যক্তি বিজয়ীদের পাওনা টাকা দিয়ে দিল। পুরো ম্যাচেই চলল এমন বাজি। শুধু পলশা গ্রামেই নয়, খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে জেলা শহরের আলীনগর, বটতলাহাট, শিবতলা, নয়াগোলাসহ জেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই নয়, জেলার বাইরে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেও আইপিএল জুয়ায় মেতেছে অসংখ্য মানুষ ও তরুণরা। রাতারাতি টাকা উপার্জনে লোভের ফাঁদে পা দিচ্ছে তারা। হাতে হাতে কিংবা মোবাইল ফোনে বিকাশের মাধ্যমেও জুয়ার টাকা লেনদেন হয়। বড় জুয়াড়িরা টাকা লেনদেন করে অনলাইনে বা হুন্ডিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা শহরের এক আইপিএল জুয়াড়ি বলেন, হরেক রকম বাজি হয়। নির্দিষ্ট কোনো বলে উইকেট পড়বে, সিঙ্গেল-ডাবল রান হবে, নাকি বাউন্ডারি হবে? কোনো ওভারে ১০ রানের কম বা বেশি হবে কি না, কিংবা উইকেট পড়বে কি না। ইনিংসে রানের পরিমাণ কিংবা খেলার ফলের ওপর বাজি হয়। ম্যাচে ভালো দলের েক্ষে বাজির হারও বেশি হয়। দরও বেশি ওঠে। ভালো দল হারলে টাকা যেমন বেশি যায়, তেমনি খারাপ দল জিতলে বেশি টাকা আসে। সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গার এক জুয়াড়ি জানায়, খেলার আগে সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যে মোবাইল ফোনে বাজি নিয়ে কথা হয়। পরে বাজির বিষয় নির্ধারিত হয়। বাজির টাকা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে বিকাশে পাঠাতে হয়। পরে যে বাজি জিতে তাকে টাকা দেওয়া হয়। এ েক্ষত্রে তৃতীয় ওই পক্ষ ১০ শতাংশ কমিশন পায়। জেলায় এমন অনেক তৃতীয় পক্ষ বা মিডিয়া রয়েছে বলে তথ্য দেয় রহিত। ক্রিকেট ঘিরে জুয়া খেলা হয়, গত বছর এমন ১২টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এরপর সেগুলো বন্ধ করে দিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশনকে (বিটিআরসি) লিখিতভাবে জানায় ডিএমপি। পরে ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে মুঠাফোনেই চলছে সর্বনাশা এই বাজির রমরমা বানিজ্য। আইপিএল ঘিরে এমন জুয়ার নেশা ছড়িয়ে পড়াকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, এ ধরনের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, যখন খেলা অর্থের দিকে চলে যাচ্ছে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজে। কারণ বাজিতে একটি পক্ষকে হারতে হয়। তাতে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বড় ক্ষতির মুখে পড়ে পরিবারের মাঝেও উটকো ঝামেলার ঘটনা ঘটছে। এমনকি পড়াশোনাতেও এসবের বিরুপ প্রভাব পড়ছে। টাকার জন্য অন্য অপরাধও করতে পারে এসব তরুণ বা শিক্ষার্থীরা। এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সমাজের সকলকে আরো বেশি সচেতন হওয়ার বিকল্প নেয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *