Sharing is caring!

Photo- Horsভোলাহাট থেকে এম.এস.আই শরীফ \ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে রাজকীয় সোয়াড়ী ঘোড়া’র ব্যবহার। এক সময়ের জরপ্রীয় ও ঐহিত্যবাহী এই ঘোড়া বা ঘোড়া’র গাড়ি পৃষ্টপোষকতা না থাকায় হারিয়ে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছেন জড়িতরা। বিশেষ করে জেলার ভোলাহাট উপজেলা থেকে একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে রাজ-রাজাদের সোয়ারী হিসেবে হোক আর যুদ্ধে ক্ষেত্রে রণাঙ্গণের একান্তই সাথী হিসেবে হোক তাদের বাহন হিসেবে একমাত্র অবলম্বন ছিলো ঘোড়া। চতুষ্পদ প্রাণী এবং প্রভু ভক্ত ঘোড়া এক সময় ছিলো ইতিহাসের পাতায়, সে সময়ের রাজা উজির-নাজির পাইক-পিয়াদা এমনকি সিপাহীরাও যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিলো ঘোড়া। ঘোড়া ছাড়া তাদের রাজকীয় কাজ-কর্ম স্থবির হয়ে পড়তো। ইতিহাসের সে সময় আর বর্তমান ডিজিটাল যুগের কথা কল্পনাতীত। সে যুগে খবর প্রেরণ করতে হতো চিঠি বা যার আদি নাম ‘পত্র’ লিপিবদ্ধ করে পত্রবাহক দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আদান প্রদাণ করা হতো বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি পত্রবাহক পাঠিয়ে গন্তব্যস্থান ভেদে ২/৪ থেকে ১০/১২ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। তবে কথায় বলে, অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়, এটাও ঠিক। সে সময়ে অপেক্ষার ক্ষণ ছিলো অতিরিক্ত আর এখনকার অতিসামান্য। বর্তমানের ডিজিটাল সময়ে সকলের হাতে হাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার বিদ্যমান। যার ফলে সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর একস্থান হতে অন্যস্থানে খবর আদান-প্রদাণ করা অতিসূলভ। যাতায়াতের জন্য রয়েছে দুর-দূরান্তের বাস-কোচ, শহরাঞ্চলে প্রাইভেট গাড়ী, হেলিকপ্টার এবং উড়োজাহাজ। নিকটে যাতায়াতের জন্য নিজস্ব মটরসাইকেল, রিক্সা-অটোরিক্সা আর বাইসাইকেল। এ ঘোড়াকে মানুষ এক সময়ে খেলাধুলার সঙ্গি হিসেবেও ব্যবহার করেছে। গ্রাম-গঞ্জে যে স্থানে ঘোড়া রয়েছে, সেখানে দল তৈরী করে ঘোড়ার রেস্ নামে খেলাধুলার প্রচলন এখনো রয়েছে। তবে আগের মত জমজমাটপূর্ণ নয়। ঘোড়ার প্রয়োজনীয়তা মানুষের মাঝে হারাতে বসেছে। ঘোড়ার বিকল্প হিসেবে অন্য পথ অবলম্বন করার জন্য এরা নিজেরাই এদেশ থেকে বিলুপ্তির পথে। বাপ-দাদারা গল্প করতে গিয়ে বলেন, এক সময় ছিলো যে আমরা বেশ কয়েকজন মিলে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসিদ্ধ রহনপুরহাট করতে গিয়ে খুব ভোরের দিকে আযান দেয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠে সকলের সাথে আগের দিন কথাবার্তা করা থাকত, আগামীকালকে খুব সকালেই রহনপুর যেতে হবে। আর এ যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল পর্যন্ত ছিলো না। তাই সকলে পায়ে হেঁটেই প্রায় ১৪/১৫মাইল রাস্তা চলতে গিয়ে সকলের মধ্যে কেউ কেউ গল্প করার লোক ছিলো, এমন গল্প করা শুরু করেছে, পথ চলতে চলতেই কখন যে রহনপুরহাট চলে এসেছে কেউ টেরই পায়নি বলে জনশ্রæতি রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর পর্যন্ত বাইসাইকেলে চড়ে গেছেন বিভিন্ন কাজের তাগিদে। এখন আর সে সময় নেই। সময় আর প্রয়োজনের তাগিদে কালের বিবর্তনে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে নিত্য-নতুন সরঞ্জামাদী প্রস্তুত করে জনসাধারণের জন্য দেশ তথা সার্বজনিন ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরী করে পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোই এনে দিয়েছে। গুরুজনেরা একসময় বলাবলি করেছে পৃথিবীটা এক সময় হাতের মুঠোই রেখে মানুষ তাদের উন্নয়নের ধারা চরম শিখরে নিয়ে যাবে বলে কথা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। সে অবস্থা বর্তমানে চলমান গতিতে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বর্তমান উদ্ভাবনাকে সফল করে মোবাইল আর কম্পিউটার ইন্টারনেটের মাধ্যমে বর্তমান প্রযুক্তিকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে তাদের আপ্রাণ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন উদ্ভাবকগণ। লিখছিলাম এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী প্রভুভক্ত চতুষ্পদ প্রাণী ঘোড়া’র কথা। কর্তব্যরত দায়িত্ব পালনের জন্য সকালে বের হয়ে উপজেলার গোহালবাড়ী ইউনিয়নের ২নং কাউন্সিলমোড় হতে দক্ষিণে রাধানগর কলোনীর পাকা রাস্তায় দেখা গেলো হঠাৎ সোয়াত্তর্ধো দাঁড়ি মুখে কানারহাট-শাহ্পাড়া গ্রামের মৃত মোহর মাহলতের ছেলে ইয়াসিন মাহলত একটি ঘোড়াকে বিভিন্ন সাজে সজ্বিত করে ছোট্ট একটি ছেলেকে সুন্নতে খাৎনা দেয়ার আগে ঘোড়ায় চড়িয়ে এলাকার বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে সালাম করে বেড়াচ্ছে। এর আগে দেখেছি সূন্নতে খাৎনা করতে ছোট্ট ছোট্ট ছেলেদের অটোরিক্সা করে ঐ ধরণের সালাম দেয়ার দৃশ্য। প্রভুভক্ত প্রাণী ঘোড়ার মালিক ইয়াসিন মাহলতের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আমি বড় সখ করে এ ঘোড়াটি খরিদ করেছি, আমার বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার জন্য। ছোট্ট ছেলেদের সুন্নতে খাৎনা দেয়ার আগে এ ধরণের ঘোড়ায় চড়িয়ে বিভিন্ন মসজিদে সালাম করে মজুরী হিসেবে কত পায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুন্নতে খাৎনা বা কোন গরীব পরিবারের বিয়ের ক্ষেত্রে আমাকে ঘোড়া নিয়ে যাতায়াতের জন্য যে যেভাবে পারে ১’শ থেকে ৫’শ টাকা উপহার হিসেবে দেয়। আমি এতেই খুবই খুশি। কারণ হিসেবে জানতে চাইলে তিনি রাজকীয় প্রাণী এক সময়ে রাজ-রাজারা একে ব্যবহার করেছে। আমি এ ঘোড়াকে ব্যবহার করে বড়ই তৃপ্তি পাচ্ছি, যা আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না বলে হেসে ফেললো ইয়াসিন মাহলত। আমি এবং আমার বাপ-দাদারা ঘোড়া গাড়ীতে এক সময় চড়ে বেড়াতো এবং বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেছে। এখন আর সহসা এ ঘোড়া আর দেখতে পাওয়া যায় না। তাই আমি সখের বসবর্তী হয়ে এ ঘোড়াটি ক্রয় করে আমার মনের আশাসহ সাধারণ জনগণের মাঝে এর চাহিদা বা এটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহন করে বলে এটা আমার বাহন হিসেবে ব্যবহার করছি। এ ঘোড়া শুধু ভোলাহাট উপজেলাতেই নয়, পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলিতেও সচরাচর চোখে পড়ে না। হঠাৎ কোন কোন এলাকায় দেখা যায়, একে ইঞ্জিনের মত করে সামনে রেখে একজন চালক ঐ ঘোড়াকে পরিচালনা করে থাকে। যাকে আমরা গ্রামের ভাষায় ‘টমটম গাড়ী রাজা’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকি। ঘোড়ার যতœ আর কদর না থাকায় এ চতুষ্পদ প্রভুভক্ত প্রাণী একেবারেই বিলুপ্তির পথে। তাই আমাদের আশেপাশে যেখানেই হোক ঘোড়া বা অস্যারোহীর প্রতি একটু সুনজর দিয়ে এর যতœ-কদর করে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে বলে অভিজ্ঞমহল মতামত ব্যক্ত করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *