Sharing is caring!

চাঁপাই’র মোহাম্মদপুর মাদ্রাসার সুপার মনিরুলের

বিরুদ্ধে প্রতারণা- স্বেচ্ছাচারিতা-অর্থ

লুটপাটের অভিযোগ

♦ স্টাফ রিপোর্টার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুরে অবস্থিত দীর্ঘদিনের পুরোনো মাদ্রাসা মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার বর্তমান সুপার মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাকুরীর নামে প্রতারণা, একাধিক জনের কাছ থেকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা নেয়া, চাকুরী না দিয়ে আবার সেই অর্থ ফেরত না দেয়া, মোটা অংকের টাকা নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ, মাদ্রাসা চত্বরে একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের বেতন নিলেও এলাকার মানুষকে ধোকা দিয়ে অনুদানের অর্থ নেয়া এবং অনুদানের লক্ষ লক্ষ টাকার সিংহভাগই নিজ পকেটস্থ করা, ভুয়া ভাউচার দিয়ে মাদ্রাসার অর্থ লুটপাট করা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তির টাকার কমিশন নেয়া, না দিলে তালিকাভুক্তি থেকে বাদ দেয়া, শিক্ষা উপবৃত্তির কমিশনের শর্তে তালিকাভূক্তি এবং সেই অর্থ আদায় করে নিজ পকেটস্থ করা, এলাকার মানুষের দেয়া মাদ্রাসার নামে জমিগুলো বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা, মাদ্রাসা চত্বরে থাকা গাছপালা বিক্রি করে আত্মসাৎ করা, অংগ প্রতিষ্ঠানের নামে আদায় করা বিভিন্ন জিনিষপত্র নিজ বাড়ির কাজে ব্যবহার করা, নিজ খেয়ালখুশি মত প্রতিষ্ঠান চালানো, এবতেদায়ী শাখার শিক্ষক হয়েও দাখিল শাখার সুপার হিসেবে নিয়োগ নেয়া, মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরন করা, একই প্রতিষ্ঠানের এবতেদায়ী শাখার প্রধান হিসেবে নিজ স্ত্রীকে নিয়োগ দেয়া এবং প্রতিষ্ঠানে সময় না দেয়া, তাঁর দূর্ণীতিতে সমর্থন না দিলে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাতারাতি চাকুরী থেকে বাদ দেয়া, এসব অনিয়মের অর্থ মহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি ও কয়েকজন সদস্যদের নিয়ে অর্থ ভাগবাটোয়ারা করা, প্রতিবাদকারী কমিটির সদস্যদের সাথে অপমানজনক ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও রয়েছে মাদ্রাসায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের প্রশিক্ষন দেয়া, একাধিক সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন পদে থেকে বিশেষ সুবিধা দেয়া দলের নেতা-কর্মীদের, জামায়াত-শিবিরের দলীয় কর্মকান্ডে সময় ব্যয় করা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলার আসামী এবং কারাভোগ করা, পবিত্র হজ্বের কাফেলার নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করা, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে কমিটির সভাপতির সাথে যোগসাজসে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষককে চাকুরীচ্যুত করে ওই পদে নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের অর্থ নেয়া। সম্প্রতি মাদ্রাসার সুপারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে চাকুরী দিয়ে আবার চাকুরী থেকে অপসারণ করে অন্যজনকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে একই চাকুরীতে নিয়োগ দেয়ায় সুপারের প্রতারণার শিকার এক শিক্ষক মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, রাজশাহী জেলা শিক্ষা অফিস, রাজশাহী দূর্নীতি দমন কার্যালয়, রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারসহ শিক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। মাদ্রাসার অনেক শিক্ষক-কর্মচারীই তাঁর এই অনিয়মের প্রতিকার চায়, তবে ভয়ে কেই মুখ খুলতে পারছেন না। কেউ কেউ খুললেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ট। নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে, তাঁরাও চায় এসব অনিয়ম ও অন্যায়ের প্রতিকার হোক। লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, দাখিল মাদ্রাসাসহ অন্যান্য অংগ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মাধ্যমে জানা গেছে, এলাকার মানুষের অনেক চেস্টা ও কষ্টের ফলে এই মাদ্রাসা মহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান সুপার মো. মনিরুল ইসলাম এলাকার মানুষকে (যাঁদের অনুদানে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন বা পরিচালনা) কোন তোয়াক্কা বা মূল্যায়ন না করে মাদ্রাসার সভাপতি (চাচা শশুর) বা পছন্দের কয়েকজন সদস্যদের সাথে যোগসাজস করে মাদ্রাসার অর্থ লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মীয়করণ, জামায়াত-শিবির দলীয় লোকদের বিভিন্নভাবে সুবিধা প্রদানসহ অভিযোগের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তিনি মাদ্রাসার জমি বিক্রি করা টাকা, মাদ্রাসা চত্বরে থাকা অনেক গাছপালা বিক্রির টাকা, সাবেক সভাপতি মরহুম ইসমাইল হক মাস্টারের মাধ্যমে মাদ্রাসার অনেক অনুদান আদায় করে নিজ পকেটস্থ করলেও তাঁরই ছেলে মো. ইসরাইলকে চাকুরীর নামে লিখিত এবং অলিখিতভাবে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। ইসরাইলকে নিয়োগ দিয়ে যোগদান করিয়ে প্রায় ৪ বছর প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর করিয়ে আবারও অন্যজনের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে একই পদে (শরীরচর্চা শিক্ষক) শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন এবং ইসরাইলকে চাকুরীচ্যুত করেছেন। প্রতারণা করে টাকাও ফেরত দেননি এখনও। এছাড়া মাদ্রাসা পার্শ্ববর্তী গ্রামের মো. মোখলেশুর রহমানকে মাদ্রাসায় কম্পিউটার ডেমোনেস্টেটর পদে চাকুরী দেয়ার নামে (নিয়োগ ও যোগদানসহ) ৬ বছর আগে প্রায় সোয়া ২ লক্ষ টাকা নিয়ে এখন পর্যন্ত টাকাও ফেরত দেননি। এখনও প্রতারণা করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চলেছেন। এলাকার প্রায় ১০/১২জন ছেলে-মেয়েকে দীর্ঘদিন মাদ্রাসায় খাটিয়ে অবেশেষে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ওইসব পদে চাকুরী দিয়েছেন অন্যদের। আর এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন থেকেই করে আসছেন বিভিন্ন সময়ে থাকা সভাপতি তাঁর চাচা শশুর আলহাজ্ব মো আফতাব উদ্দিন এবং আলহাজ্ব মো. আহসান আলী মাস্টারকে নিয়ে। মাদ্রাসা ও অংগ প্রতিষ্ঠানের কমিটিগুলোও পকেট কমিটি। নিজ পছন্দের এবং তাঁর আত্মীয়দের নিয়েই কমিটিগুলো গঠন করেন তিনি। তারপরও কমিটির যাঁরা তাঁর এসব অনিয়মের বিষয়ে তেমন একটা নাক গলান না তাদের সাথেই যোগসাজস। মাদ্রাসার চত্বরে থাকা বেশকিছু মুল্যবান গাছ প্রায় আড়াই লক্ষ টাকায় বিক্রি করেছেন এবং ভুয়া, মনমত এবং সাজানো খরচ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দাখিল মাদ্রাসা চত্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসা করার জন্য মহাম্মদপুর হেফজুল একাডেমী, মক্তব, নুরাণী একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিজেই থেকে বিভিন্ন অনুদানের লক্ষ লক্ষ টাকা লুটপাট করছেন। হেফজুল একাডেমীর আজীবন সদস্য (প্রায় ২ শতাধিক) প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসিক অনুদান, এলাকার মানুষকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের হাফেজিয়া পড়ানোর নাম করে অনুদানের অর্থ সিংহভাগই কোন হিসাব ছাড়ায় ভোগ করছেন, হেফজুল একাডেমীর সকল ছাত্রর কাছ থেকে বেতন নিলেও নিম্ন মানের খাবার দিয়ে ভুয়া ভাউচারে খরচ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছেন, এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এলাকার মানুষের দেয়া অনুদানের অর্থ ও বিভিন্ন দ্রব্যাদী (ইট, সিমেন্ট, খোয়া, দরজাসহ বিভিন্ন জিনিষ) নিজ বাড়িতে এবং বিক্রি করে পকেটস্থ করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া অর্থের সঠিক কোন হিসাব দেন না তিনি কোনদিনই। আত্মীয় সভাপতিকে ম্যানেজ করে এসব দূর্ণীতি করে যাচ্ছেন তিনি। কয়েক বছর আগে তিনি একই মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার প্রধান হিসেবে নিজ স্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছেন। মাদ্রাসায় নিয়োগ দিয়েছেন তাঁর স্ত্রীর বোনের মেয়েকেও। ফলে এবতেদায়ী শাখার দায়িত্ব পালনে তাঁর কোন জবাবদীহিতাও নেই। মাদ্রাসা, হেফজোখার ছাত্রদের এবং মাদ্রাসার কর্মচারী এমনকি শিক্ষকদের দিয়ে বাধ্যতামূলক ব্যক্তিগত বা বাড়ির কাজ করিয়ে নেন। হেফজোখানার তত্বাবধায়কদের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় হওয়া টাকা নেয়া, এমনকি বার্ষিক জলশায় দেয়া মানুষের অনুদানের টাকাও চুরি করতেও দ্বিধা নেই তাঁর। সব মিলিয়ে ব্যাক্তিগত, পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে দেখছেন এই মাদ্রাসা এবং ব্যবসার নামে গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানগুলোকে। মাদ্রাসার চাকুরী করেও তিনি কোন জবাবদিহিতার ধার ধারেন না। যা ইচ্ছে তাই করে চলেছেন। তাঁর দূর্ণীতি ও অনিয়মের কারণে এলাকার শিক্ষানুরাগী ও সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্ধ। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ এমনভাবে ভক্ষন করায় রীতিমত হতভম্ব। এলাকার মানুষ ও মাদ্রাসা চত্বরে একাধিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটির লোকজনও তার দূর্ণীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন এবং তাদের কোন মতামত ছাড়াই বা নিজ ইচ্ছামত প্রতিষ্ঠানগুলো চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির সদস্যগণ। মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসা, হেফজুল কোরআন একাডেমীসহ সকল প্রতিষ্ঠানের কমিটির অধিকাংশ সদস্যগণও অতীষ্ঠ তার এসব অবৈধ কর্মকান্ডে। তাঁরাও চান এসব অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিচার ও অবসান হোক। এসব অভিযোগের সাথে একমত পোষণ করেছেন দাখিল শাখার পরিচালনা পর্ষদের অনেক সদস্য, হেফজুল একাডেমীর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, চাকুরীচ্যুতরা এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা। সকলেরই অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধের সকল অভিযোগ সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থা একদম ভেঙ্গে পড়েছে এবং আগামীতে আরও অরাজকতা সৃষ্টি হবে। এব্যাপারে মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আলহাজ্ব মো. আহসান আলীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। হেফজুল শাখার সভাপতি আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন কে পাওয়া গেলেও বয়সের ভারে কানে একদম না শুনতে পাওয়ায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। এব্যাপারে মোহাম্মদপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার ও হেফজুল কোরআন একাডেমীসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে লিখিতভাবে বিভিন্ন দপ্তরে হওয়া অভিযোগ এবং স্থানীয় বা কমিটির লোকজনের দেয়া অর্থ লুটপাট, অবৈধ নিয়োগ, স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়মসহ সকল অভিযোগ অ¯স্বীকার করে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে একটি মহল ইর্শ্বন্বিত হয়ে এসব বানেয়াট কথাবার্তা বলছেন। তাঁর এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যই এসব মিথ্যা অভিযোগ করেছে। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন সকল প্রতিষ্ঠানের কমিটি। যা করেছে, কমিটির সদস্যরা করেছে। আমি মাদ্রাসার সুপার হিসেবে যেটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার সেটুকুই করি। এলাকার প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ বা লেখালেখি না করার জন্যও অনুরোধ জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *