Sharing is caring!

রিপন আলি রকি, শিবগঞ্জ \ স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে না থাকায় এবং ‘জয় বাংলা’ বলায় বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করেছিল পাক বাহিনীর সেনারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের শহীদ আব্দুল বারী চৌধুরীকে। নির্মমভাবে হত্যার পর তাদের দোসরদের ভয়ে এই শহীদের লাশ ৩দিন ধরে দাফনও করতে পারেনি আব্দুল বারী চৌধুরীর পরিবার। কোনরকমে রাতের আধাঁরে মাটি চাপা দিয়ে পালিয়ে বাঁচেন পরিবারের সদস্যরা। আজও সেই স্মৃতি কাঁদিয়ে বেড়ায় শহীদের পরিবারকে। তারপরও মেলেনি কোন স্বীকৃতি বা কোন সহায়তা। কেউ খোঁজও না নেয়ার ক্ষোভ তাদের। সেসব অত্যাচারীদের বা স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের দাবি পরিবারের। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন ৮ই অক্টোবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পাকবাহীনিরা আমাদের বাড়ির দরজা ভেঙ্গে আমার বাবা আব্দুল বারী চৌধুরীকে বাড়ির উঠোনে দাঁড় করিয়ে বুকে অস্ত্র ধরে বলতে বলে পাকিস্থান জিন্দাবাদ, প্রতিউত্তরে আমার বাবা বলেছিলেন, জয়-বাংলা, জয়-বঙ্গবন্ধু তিনবার তাদের প্রশ্নের উত্তরে এই প্রতিউত্তর দেওয়ায় প্রায় ১ ডজন গুলি করে আমার বাবার দেহটাকে ঝাঁঝরা করে ফেলে চলে যাই পাকবাহীনিরা। তখন আমি ৮ বছরের শিশু নিরবে তাকিয়ে থাকলাম কিছুই করতে পারিনি। মা সুরুজ জাহান চৌধুরী এই সময় প্রতিবাদ করলে শারীরিক ও মানসিক ভাবে লাঞ্চিত করা হয়। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও সারাক্ষন সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলে অসহ্য যন্ত্রনা হয়, কান্না জর্জরিত কন্ঠে কথাগুলো বললেন, শহীদ আব্দুল বারী চৌধুরীর বড় সন্তান আবু হায়দার চৌধুরী। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও এখনও পরিবারটির মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। দেশের জন্য প্রাণ দিলেও খোঁজ নেয়নি এই পরিবারটির কেউ কোনদিন। পরিবারের দাবী অন্ততঃপক্ষে তাঁর বাবার জীবন উৎসর্গ করার স্বীকৃতিটুকু দেয়ার। তিনি আরও বলেন, আমার বাবাকে হত্যার পর দাফনের জন্য শান্তি কমিটির সদস্য গোফরা জোলা (বর্তমান মৃত) নিকট জানাজা ও দাফনের জন্য অনুরোধ করলেও সে উত্তেজিত হয়ে আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমার বাবার শখের বিদেশী কুকুর (কলকাতা ব্যান্ডেল) থেকে কিনে আনা “জিপ্পী” তিন দিন ধরে আমার বাবার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাহাড়া দিয়েছিল। তিন দিন পরে রাতের অন্ধকারে আমার আত্মীয়রা গোপনে জানাজা, কাফন ও পাটাতন ছাড়াই দাফন করে হয় আমার বাবাকে। ঘটনাটি ঘটেছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামে। শহীদ আব্দুল বারী চৌধুরী ছিলেন, স্বনামধন্য চৌধুরী পরিবারের সন্তান। তিনি ই.পি.আর বাহীনির কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খারাপ আচনের কারনে স্বেচ্ছায় চাকুরী ছেড়ে চলে আসেন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী করায় ক্ষোব ও তিব্র নিন্দা প্রকাশ করেছিলেন বলে একই এলাকার বাজিতপুর গ্রামের রাজাকার শাহজাহানের উপস্থিতিতে পাকবাহীনিরা এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। সরেজমিনে ঘটনার ব্যাপারে জানতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্যান্য শহীদ পরিবারের লোকজন জানান, শুধু আব্দুল বারী চৌধুরী নয়, সোহরাব হোসেন, আফতাব চৌধুরী, মিন্টু চৌধুরী, কয়েশ আলীসহ ১০জন স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং তাদেরও একইভাবে দাফন করা হয়। যা বর্তমানে শুধুই স্মৃতি। ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে নূরুনব্বী ও আবু জোসনার (বর্তমান মৃত) বরাত দিয়ে অন্যান্য শহীদ পরিবারের লোকজন আরও জানান, যুদ্ধকালীন সময় শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পরিবেশনসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করার কারনে তৎকালীন শ্যামপুর ইউনিয়নের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির মিঞা (বর্তমান মৃত) ও শান্তি কমিটির সদস্য রবু মিঞা, বাবু মিঞা, গোফরা জোলা-সহ (সকলেই মৃত) শান্তি কমিটির অনেকেরই সহযোগিতায় পাক-বাহীনি ১৯৭১ সালে ৮ই অক্টোবার এই নির্মম হত্যাকান্ড চালাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভের সাথে জানান, শান্তি কমিটির সদস্যদের পরিবারের উত্তরসূরীরা বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে ভূমিকা পালন করছে।  শহীদ সোহরাব হোসেনের ছেলে মোহা. বাবুল হোসেন জানান, যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম ডা. মঈন উদ্দিন আহমেদের প্রচেষ্টায় শ্যামপুর ইউনিয়নের ১০ শহীদ পরিবারকে ১ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছিলেন। তারপর আর কেউ কোন দিন খোঁজ নেননি। তিনি বর্তমান স্বাধীনতা পক্ষের সরকারের নিকট এই হত্যাকান্ডের বিচার দাবী করছি। এব্যাপারে দেশের প্রথম যুদ্ধাপরাধী মামলার বাদী উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের পারচৌকা গ্রামের শহীদ মুসলিম উদ্দিনের ছেলে বদিউর রহমান বুদ্ধু জানান, ঘটনাটি অত্যান্ত বেদনাদায়ক ঘটনার সঠিক তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *