Sharing is caring!

দর্পণ ডেস্ক \ একসঙ্গে ধান এবং গম কাটা, মাড়াই, ঝাড়া ও বস্তাবন্দী করার যন্ত্র তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার পাটুলের সৃষ্টি ইঞ্জিনিয়ারিং এর মালিক তরুণ মাইনুল সরকার (২৫)। যন্ত্রটি দিয়ে এ বছর নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় বোরো ধান কেটে ঘরেও তুলেছেন কৃষকেরা। মাইনুল সরকারের তৈরি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। কাটার সঙ্গে সঙ্গেই মাড়াই-ঝাড়া এবং বস্তাবন্দী হয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার নামে পরিচিত। এতে ধান কাটায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সময় ও খরচ অনেক কম লাগে। আর মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে অনেক ধানের অপচয়ও হয় না। নতুন-পুরোনো যন্ত্রপাতি ও লোহালক্কড় দিয়ে মাইনুল সরকারে এই যন্ত্র তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক, নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে ভূয়সী প্রশাংসা করেছেন । এলাকার কৃষকরা জানান, ১৫ জুন সকালে নলডাঙ্গা উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামে গিয়ে মাইনুলের তৈরি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে দেখা যায়। কৃষক মনিরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, যন্ত্রটি দিয়ে দেড় ঘন্টারও কম সময়ে এক একর জমির ধান কাটা-মাড়াই-ঝাড়া ও বস্তায় ভরা যাচ্ছে। টাকা দিতে হচ্ছে দুই হাজার। যন্ত্রটি ভাড়ায় নেওয়ার জন্য অনেক কৃষকই আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তিনি ১০ দিন আগে যোগাযোগ করে যন্ত্রটি ভাড়া পেয়েছেন। একই এলাকার কৃষক আলী আকবর, শমসের আলী ও মকছেদ আলী বলেন, বর্তমানে ধানকাটা শ্রমিক পাওয়া কস্টকর। পাওয়া গেলেও বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা। কমপক্ষে ১৫ জন শ্রমিক সারা দিন কাজ করলে এক একর জমির ধান কাটা-মাড়াই করতে পারেন। ব্যয় হয় কমপক্ষে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। তা ছাড়া শ্রমিক দিয়ে কাজ করালে অনেক ধানের অপচয়ও হয়। কিন্তু এ যন্ত্রে অপচয়ের বালাই নেই। মাইনুলের তৈরি কম্বাইন্ড হারভেস্টারের প্রথম ব্যবহারকারী কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই যন্ত্র দিয়ে তিনি দুই দিনে ১০ একর জমির ধান কেটেছেন। এতে তাঁর খরচ পড়েছে ৩৫ হাজার টাকা। এক গ্রাম ধানও নষ্ট হয়নি। ওই ধান শ্রমিকদের দিয়ে কাটালে কমপক্ষে ৬৫ হাজার টাকা খরচ হতো। চীন ও কোরিয়ার তৈরি হারভেস্টারের চেয়ে তাঁর তৈরি যন্ত্রে কৃষকের অর্ধেকেরও বেশি টাকা সাশ্রয় হবে। কোরিয়ার যন্ত্রটির দাম প্রায় ২৯ লাখ টাকা হলেও তাঁর খরচ হয়েছে সাড়ে আট লাখ টাকা। তবে যন্ত্রটি আরও দক্ষ, টেকসই করতে হলে খরচ হবে মোট প্রায় দশ লাখ টাকা। চীন ও কোরিয়ার কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে এক একর জমির ধান কাটা-মাড়াই-ভাড়া ও বস্তায় ভরতে সময় লাগে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট। ডিজেল লাগে ১৫-১৬ লিটার। যন্ত্রটির গতি কম হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিতে আলাদা গাড়ি লাগে। খুচরা যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যায় না। বড় শহরে পাওয়া গেলেও দাম বেশি।
কিন্তু মাইনুলের তৈরি কম্বাইন্ড হারভেস্টারে একই পরিমাণ জমির কাজে এক ঘন্টা সময় লাগে। ডিজেল খরচ নয়-দশ লিটার। গতি বেশি হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজেই নেওয়া যায়। ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশও সহজলভ্য। তিন দিন প্রশিক্ষণ দিলে যে কেউ এই যন্ত্র চালাতে পারেন। কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও মাইনুল পেশায় ছিলেন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি। পরে নিজগ্রাম পাটুলে সৃষ্টি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস শপ নামে একটি প্রতিষ্টান চালু করে। সেখানে মূলত ধান মাড়াই, আখ মাড়াই, ভুট্টা মাড়াই মেশিন তৈরী এবং মেরামতের কাজ করতেন। ফলে কৃষি থেকে কিছু আয় থাকলেও সংসারে বেশ টানাটানি পড়ে যায়। স¤প্রতি ধানকাটা শ্রমিকের অভাব দেখা দেওয়ার পর কৃষক পরিবারের সন্তান মাইনুল নিজেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার তৈরির কাজে হাত দেন। এই কাজে তাঁকে সহায়তা করে সুষ্টি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের কর্মীরা। ২০১৭ সালেই প্রথম যন্ত্রটি তৈরি করেন তিনি। কিন্তু সেটিতে সামান্য ত্রæটি থাকায় ব্যবহারযোগ্য হয়নি। এই সময় সরকার শুরু করে খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প। কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার উৎসাহিত করতে কৃষকদের ঋণ সহায়তা এবং ভর্তুকি দামে যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ দেওয়া হয়। অবশেষে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে তিনি সফল হন। এখন যন্ত্রটি আরও আধুনিক করতে কাজ করছেন। তিনি দুটি যন্ত্র তৈরি করেছেন। সরকারী সহায়তা পেলে আরও আধুনিক কম্বাইন্ড হারভেস্টার তিনি কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবেন।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *