Sharing is caring!

নির্বাচনি ইশতেহারের সাতকাহন:

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

নির্বাচনি ইশতেহার মানেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। নির্বাচন পরবর্তী ৫ বছর দেশকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের ভাবনা ও কর্মপরিকল্পনা ফুটে ওঠে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার প্রকাশের পরপরই তাদের ইশতেহার নিয়ে চলছে চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার নিয়ে চলছে তুলনামূলক বিশ্লেষণ হচ্ছে।
বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের সাথে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে আলাদা আলাদা ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের বাকি শরিক দলগুলো। ফলশ্রুতিতে এবারের নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে মূলত ত্রিমুখী তুলনামূলক বিশ্লেষণ চলছে সব মহলে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারটি যথেষ্ঠ কৌতুহলোদ্দীপক। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারটি মূলত কয়েকটি খুবই ছোট ছোট গুরুত্বহীন রাজনৈতিক দলের ইশতেহার, যেহেতু পরের দিনই আলাদা ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি।

ঐক্যফ্রন্টের শেষে এক জায়গায় লেখা আছে- মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনা নিয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলা হবে। যদিও তারা এখন মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা দেশে রয়েছে সেটি কোন যুক্তিতে মিথ্যা চেতনা সেবিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। আর এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাচাই করার পদ্ধতি কী, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা নেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে।
সব ইশতেহারের মাঝেই ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে কথা-বার্তা থাকে। এই ইশতেহারেও আছে। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে একটি কৌতুকের ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে, ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে সঠিক কক্ষপথে নতুন স্যাটেলাইট প্রেরণ করা হবে। সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এই প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট হাসির খোরাক জুগিয়েছে। যারা মোটামুটি বিজ্ঞানমনস্ক তারা জানেন, জিও স্টেশনারী স্যাটেলাইটের কক্ষপথ নির্দিষ্ট, সেই কক্ষপথে স্যাটেলাইট বসালে পৃথিবীর নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সার্বক্ষণিকভাবে স্যাটেলাইটটাকে দেখা যায়। এই কক্ষপথে অসংখ্যা স্যাটেলাইট বসানো আছে যেগুলো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখছে। এখানে সঠিক বা বেঠিক কক্ষপথ বলে কিছু নেই, একটিই কক্ষপথ।

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান রাখবে তারা, তবে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের সাথে জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাওয়াটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত এই প্রশ্নটা থেকেই যায়।
ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের বাকি অংশ হরেক রকম গতানুগতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাজানো হয়েছে, আলাদা কোনো চমক লক্ষ্যণীয় হয়নি।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রায় ত্রিশ পৃষ্ঠার ইশতেহারের তুলনায় বিএনপির নয় পৃষ্ঠার ইশতেহারটি যথেষ্ঠ ছোট। বিএনপির ইশতেহারের সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের মূল পার্থক্যটা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে। ধারণা করা হচ্ছে জামায়াতকে সন্তুষ্ট করতেই কৌশলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলমান রাখার ব্যাপারটি কৌশলে এড়িয়ে গেছে বিএনপি।
এছাড়া প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা, একদলীয় শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটনো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতাসহ যে সকল দিক বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখিত হয়েছে তা শুধুই বিএনপির রাজনৈতিক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর প্রথম দশ দিনেই সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের ৮ জন নেতাকর্মীকে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে হত্যা করেছে, তাদের ইশতেহারে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা বেমানান।

বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারের বাকি অংশ মোটামুটি সাদা মাটা, একটি ইশতেহার গৎ বাঁধা যে জিনিসগুলো থাকতে হয় মোটামুটি সেগুলোই আছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে এবার সব থেকে চমকপ্রদ ইশতেহারটি এসেছে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর, কর্মসংস্থান নিশ্চত করার পাশাপাশি সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে গত দশ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে। ৮৪ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারটি যথেষ্ঠ সুলিখিত। এটি শুধু যে গুছিয়ে লেখা হয়েছে তা নয় এটি শেষ করা আছে সুকান্তের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে। শুধু তাই নয় এটি একমাত্র ইশতেহার যেখানে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্রাফ ব্যবহার করা হয়েছে।
এই ইশতেহারের প্রত্যেকটি অঙ্গীকার লেখার আগে এই সরকার গত দশ বছরে এই বিষয়ে কী কী কাজ করেছে সেটি উল্লেখ করে দিয়েছে। অতীতের অর্জনগুলো তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করায় ভবিষ্যতের অঙ্গীকার পূরণ নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধা কিংবা কেউ কোনও প্রশ্ন করতে পারবে না।
এই ইশতেহারে অসংখ্য পরিকল্পনার কথা দেওয়া আছে। যথেষ্ঠ খুঁটিনাটির কথা বলা আছে। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়ার অঙ্গীকার করা আছে। তথ্য প্রযুক্তির কথা বলার সময় সেখানে ব্লক চেইন শব্দটির ব্যবহার মূলত তথ্য প্রযুক্তি খাতে আওয়ামী লীগের দূরদর্শিতার প্রমাণ বহন করে।

এছাড়া ‘তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে তরুণদের স্বপ্ন ও চাহিদা বিবেচনায় রেখে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে এবং স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গঠন করতে ২০২১ সালের মধ্যে ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’, একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরি করতে ২০২৩ সালের মধ্যে ‘কর্মঠ প্রকল্প’ এবং প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে আরেকটি মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। এই স্লোগানকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে বলছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বরাবরই গ্রামকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রীয় দর্শন হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। স্বাধীন দেশে জাতির পিতা সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে অঙ্গিকার যুক্ত করেছিলেন। বর্তমান সরকার প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে।
একটি দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই আওয়ামী লীগের এই ঐতিহাসিক ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। ঢাকা শহরের দূষণমুক্ত বাতাস কিংবা কর্মজীবী মায়েদের জন্যে ডে কেয়ার। কিংবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্যে ব্রেইল বই কিংবা গবেষণার জন্যে বাড়তি ফান্ড এরকম সব কিছুই আছে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে।

রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুঁড়িতে পরিপূর্ণ ইশতেহারের অঙ্গীকার সমূহ বাস্তবায়ন নিয়ে এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে সব সময়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে গত ২১ বছরের ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি পরিসংখ্যান ওঠে এসেছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী কোন দল কতটুক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক,
(১৯৯১- ১৯৯৬) শাসনামলে বিএনপি সরকার ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণ করছে ৩৩%
(১৯৯৬-২০০১) শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণ করছে ৫২%
(২০০১-২০০৫) শাসনামলে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণ করছে ২৪%
(২০০৮-২০১৪) শাসনামলে আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণ করছে ৬৭%
(২০১৪-২০১৮) শাসনামলে আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকার ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণ করছে ৮২%
উপরোক্ত বিশ্লেষণ হতে এটি সহেজই অনুমেয় যুগোপযোগী ইশতেহার এবং ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আওয়ামী লীগ। ফলশ্রুতিতে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যালট বক্সে এর প্রতিফলন ঘটবে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *