Sharing is caring!

বিলুপ্তির পথে বরেন্দ্র এলাকায় তালগাছ

♦ সফিকুল ইসলাম, গোদাগাড়ী

কবির ভাষায়-তালগাছ এক পায়ে দাড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে উকি মারে আকাসে। কিংবা ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলের সেই পরিবেশ বান্ধব তালগাছ এখন আর আকাশে উঁকি মারে না। কিংবা তালগাছ দেখে এখন আর গাঁ ও চেনা যায় না, কালের বিবর্তনে এখন তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চলের দিগন্তের দিকে তাকাতে গেলেই চোখে পড়ত উঁচুউঁচু তালগাছের ঝাকড়া ঝাকড়া মাথা। কিন্তু এখন দিগন্তের দিকে চোখ মেললেই তালগাছের মাথাতো দুরের কথা, বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে তালগাছের দেখা মেলাই ভার। এক সময় গ্রামের কৃষক ও সাধারণ মানুষের অনেক কাজ এই তালগাছ ছাড়া কল্পনা করা যেত না। গ্রামের সাধারণ মানুষ ও কৃষকেরা বাড়ী তৈরীর উপকরণ তীর, বর্গা, খুঁটি, কৃষি কাজের জন্য গরুর গাড়ীর ধুরি, গরুকে খাওয়ানোর পাত্র, লাঙ্গলের রিসসহ বিভিন্ন কাজে তাল গাছের ব্যবহার ছিল সর্বাগে। তালগাছ গভীর মূলী ও শাখা প্রশাখা নেই বলে জমির আঁইলে রোপনে খাদ্য পুষ্টির প্রতিযোগিতা নেই ও ছায়া দিয়ে ফসলেরও কোন ক্ষতি করে না। তালের পাতা দিয়ে তৈরী হাত পাখা, মাদুর, টুপি, ঘরের ছাউনী, চাটাই, ছাতা, লকরী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গাছের ফাইবার বা আঁশ থেকে বিভিন্ন রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়, যথা-টুপি, ঝুড়ি, ব্রাশ পাপোষ, ছোট বাষ্কেট ও মাছ ধরার খলশানীতে ব্যবহৃত হয়। পুরুষ গাছের ফুল বা জটা হতে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড়, পাটালি, ভিনেগার, পিঠা, বড়া, লুচি, ইত্যাদি তৈরি করা হয়। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা, বড়া, খির, পায়েস তৈরি করা হয়। কেনা জানে কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস মুখরোচক পুষ্টিকর ও ছোট বড় সবার প্রিয়। পাকা তালের আঁঠি মাটির নিচে পুতে রেখে আঠির মধ্যে তৈরী পিঠা শিশু থেকে বয়বৃদ্ধ সবার প্রিয়। তালগাছ পরিবেশ বান্ধব ও বটে, তালগাছ উঁচু হওয়ার ফলে বজ্রপাত তার উপরে পড়ে ফলে আশেপাশের বাড়ীঘর রক্ষা পাই বজ্রপাতের ক্ষতির ভয়াবহতা থেকে। গুচ্ছ মূলী বৃহৎ অশাখ বৃ¶ তালগাছের গোড়ার দিক মোটা, উপরের অংশ তুলনামূলক চিকন, কান্ডের মাথায় বোটা ও পাতা গুচ্ছভাবে সাজানো থাকে ও বোটার দু-ধারে করাতের মতো দাঁত আছে, বোটা শক্ত ও খুব পুরু। গাছ উচ্চতায় ২০ থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘ জীবি উদ্ভিদের মাঝে অন্যতম হচ্ছে তালগাছ। ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তালগাছের বৃদ্ধি ধীর গতি সম্পন্ন, বীজ রোপনের ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সে গাছে ফল ধরে। তাল গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে যায়। তাল গাছ কৌশিক প্রক্রিয়ায় শিকড়ের মাধ্যেমে ভু-গর্ভস্থ পানি রির্চাজে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক ভুমিকা রাখতো। তাল গাছের পাতায় বাবুই পাখিরা বাসা বেঁধে থাকতো। বাবুই পাখি ধান ক্ষেতের পোকা মাকড় ধরে ধরে খেত, ফলে কৃষকদের ধান ক্ষেত০০ পোকা মাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেত। তাল গাছ না থাকায় আশ্রায় স্থলের অভাবে বাবুই পাখি হরিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে কৃষি ক্ষেত্রে। তাল গাছ জন্মানোর জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ ছিল উপযোগী। তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের যেখানে সেখানে তাল গাছ জন্মাতে পারতো। কালের বির্বতনে ও আধুনিকতার ছোয়ায় তালগাছ এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিকতার ছোয়ায় বাড়ী ঘর তৈরীতে ব্যবহার হচ্ছে লোহার রড, ইট-বালুর তৈরী খুটি ও কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে বৈঞ্জানীক যন্ত্রপাতি। ইঞ্জিন চালিত গাড়ীর কারনে গরুর গাড়ী হারিয়ে যাচ্ছে। এতে করে তাল গাছের ব্যবহার আর নেই বললেই চলে। তালগাছ জন্মানোর জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ উপযোগী হলেও তাল গাছের চাহিদা এবং ব্যবহার না থাকায় বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ আর তাল গাছ রোপন করছে না। তাই পরিবেশ বান্ধব এই তাল গাছ রক্ষার্থে তাল গাছের ব্যবহার এবং রপ্তানীর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিলে আমরা আবারো ফিরে পেতে পারি বরেন্দ্রর সেই চিরচেনা রূপ এমনাই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *