Sharing is caring!

মনোনয়ন বাতিল: বিএনপির এক ডজন প্রার্থীর

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা

 

নিউজ ডেস্ক: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেবল ঋণখেলাপির দায়ে বিএনপির অসংখ্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। জানা গেছে, মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির এক ডজন প্রার্থীর কাছে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।এদের মধ্যে বিএনপি আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বন্ধ হয়ে যাওয়া টেলিকম কোম্পানি সিটিসেলের মালিক এম মোর্শেদ খানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৩শ’ কোটি, ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদে’র সঙ্গে ভারতের দিল্লীতে ‘সরকার উৎখাতে বৈঠকের অভিযোগে আটক হওয়া চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯শ’ ৫০ কোটি এবং চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শামসুল আলমের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭শ’ ৮০ কোটি টাকা।

বৃহৎ অংকের ঋণ খেলাপির দায়ে মনোনয়ন বাতিল হওয়া বিএনপির এক ডজন প্রার্থীর মধ্যে আছেন- মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিএনপি আমলের বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ একাধিক নেতা।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছিলেন বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী এম মোর্শেদ খান। ঋণখেলাপির দায়ে তার মনোনয়ন বাতিল করে রিটার্নিং কর্মকর্তা। এম মোর্শেদ খানের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। জানা যায়, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯২ সালে প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সিটিসেলের নামে বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নেয়া হয়। বেসরকারি খাতের এবি, ব্যাংক এশিয়া, কমার্স, ব্র্যাক, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, দ্য সিটি, ইস্টার্ন, এক্সিম, আইপিডিসি, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, ট্রাস্ট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নেয় গ্রুপটি। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের বিষয়ে সিটিসেল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও অর্থ দিতে পারেনি প্যাসিফিক গ্রুপ। এক পর্যায়ে কর্মী ছাঁটাই এবং সর্বশেষ সিটিসেল বন্ধ ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি।

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন থেকে মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় জেলে থাকা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর। এবি ব্যাংকসহ ২৭টি ব্যাংকে তার খেলাপি ঋণ থাকায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়। জানা যায়, বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ রয়েছে আসলাম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাইজিং স্টিলের। বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৬৯ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৩২৫ কোটি, সাউথ-ইস্ট ব্যাংক হালিশহর শাখার ১৪৮ কোটি ও ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১০৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এছাড়া গত বছর রাইজিং স্টিলের কাছে ৮ কোটি টাকা পাওনা আদায়ে আইডিএলসি ফিন্যান্স, ৯ কোটি আদায়ে ব্যাংক এশিয়া ও ৭০ লাখ টাকা আদায়ে সিটি ব্যাংক মামলা করে। এছাড়া ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদে’র সঙ্গে ভারতের দিল্লীতে ‘সরকার উৎখাতে বৈঠকের অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন তিনি। আসলাম চৌধুরী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপের বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণের মামলায় তার স্ত্রী জামিলা নাজনীনকে গত বছর গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। একই আসন থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন তার ভাই আমজাদ হোসেন। আসলাম চৌধুরী ও আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও মুন্নু গ্রুপের কর্ণধার মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতা মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে মনোনয়ন কিনেছেন। তাদের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফেব্রিক্স সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তাদের প্রতিষ্ঠানের খেলাটি ঋণের পরিমাণ ২৩০ কোটি টাকা। ঋণ নবায়নের জন্য এককালীন ডাউন পেমেন্ট বাবদ ১১ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। ঋণ নবায়ন প্রস্তাব অনুমোদন হওয়ায় রিতার মনোনয়ন বাতিল হয়নি বলে সূত্রে জানা গেছে।

ঋণখেলাপি হওয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। গিয়াস উদ্দিন কাদের চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। একইসঙ্গে ঋণখেলাপির অভিযোগে তার পুত্র সামির কাদের চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। সামির কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনের জন্য বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পুত্র সামির কাদের চৌধুরী দুজনই অগ্রণী ব্যাংকে ঋণখেলাপি। এ ব্যাংকের ঢাকার মতিঝিল শাখায় দুজনের নামে খেলাপি ঋণ ২৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী দি ঢাকা ডায়িং ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সামির কাদের চৌধুরী একই কোম্পানির পরিচালক হিসেবে এ ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়েছেন।

সূত্র মতে, বছর তিনেক আগে পুঁজি সঙ্কটের কারণে ঢাকা ডায়িং নামে গিয়াস উদ্দিনের শিল্পকারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ছেলে সামির চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি চেকের মামলায় ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। মামলাটি করেছিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামের কোতোয়ালি-বাকলিয়া আসন থেকে বিএনপির টিকেট পেয়েছিলেন এমইবি গ্রুপের কর্ণধার শামসুল আলম। কিন্তু ঋণখেলাপির দায়ে তার মনোনয়ন বাতিল করে রিটার্নিং কর্মকর্তা। জানা গেছে, ১৫টি ব্যাংকে ঋণের পাহাড় জমেছে তার। ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় ২১৬ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করায় গত বছর খেলাপিও হন তিনি। সব মিলিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৭৮০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি তথ্য রয়েছে ব্যাংকগুলোর কাছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক অর্ধশতাধিক মামলা করেছে শামসুল আলমের বিরুদ্ধে। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ফিশ এ্যান্ড ফ্রগলেসের কাছে সোনালী ব্যাংকের বকেয়া ঋণ পাঁচ কোটি ২৯ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছে আমীর খসরুর মিহির গার্মেন্টসের বকেয়া ২২ লাখ টাকা। তারই আলফা প্যাকেজেসের (বিডি লি.) কাছে ঢাকা ব্যাংকের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২৮ লাখ টাকা। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হোটেল সারিনার কাছে ঢাকা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের বকেয়া ঋণ ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

মনোনয়নপত্রে ১০টি মামলার তথ্য গোপন করেছেন রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী এ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফা। বেসিক ব্যাংক থেকে আড়াই কোটি ঋণ টাকা পরিশোধ না করায় খেলাপি হয়েছেন তিনি। এসব কারণেই নির্বাচনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। টেলিফোন বিল বিল বকেয়া ও ঋণখেলাপি হওয়ায় ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আফরোজা আব্বাসকে ঋণখেলাপি হিসেবে অবহিত করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক মিলিয়ে তিনি কয়েক কোটি টাকার ঋণখেলাপি। সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ঢাকা ৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনের মনোনয়নপত্রও এক লাখ টাকা ঋণ খেলাপের কারণে বাতিল হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির সেলিম ভূঁইয়া, ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে বিএনপির প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী নূর মোহাম্মদ খান, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মেজর (অব.) আকতারুজ্জামান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে বিএনপির কাজী নাজমুল হোসেনের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের কয়েক কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *