Sharing is caring!

মিসেস কাওসার মহল (পারুল)
বীর মহিলা মুক্তিযোদ্ধা

“কোনো কালে একা হয়নিও জয়ী পুরুষের তরবারী,
সাহস দিয়েছে শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে বিজয়ী লক্ষী নারী”
১৯৭১ সাল \ ঐ দিনটি আমার খুব মনে পড়ে যেদিন মরহুম পিতা আওয়ামীলীগের সংগঠক রমিজউদ্দিন বিশ্বাসকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজাকার বাহিনী গুলি করে হত্যা করার জন্য। “মুক্তাশা সিনেমা হলের কাছে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হচ্ছে”। এমন সময় ছাত্রলীগের নেতা আশরাফুল হক। বর্তমানে ডা. আশরাফুল হক (চুনু) সংবাদ পেয়ে বেশ কিছু ছাত্র ও লাঠি সোটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে ও মৃত্যুর মুখোমুখি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আর তো দেশে থাকা যায়না, আমি তখন রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী পিতার সাথে সুদুর ভারতে পাড়ি জমালাম বাসায় রয়ে গেলেন- স্নেহময়ী “মা” আর বড় বনের পাঁচ বৎসরের শিশু মাহমুদ। বাঙালী জাতির শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলাদেশের স্থাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে, ৭ই মার্চের ডাকে ১৬ কোটি বাঙালীকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির লক্ষ্যে, পিতার আদর্শে আদর্শিত হয়ে, চাচা জান গ, খ, অ খালেদ আলী মিয়ার আদর্শে আদর্শিত হয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলাম।
“একাত্তোর কালো মেঘে সূর্য যখন অন্ধকার,
রক্ত দিয়ে আনব স্বাধীনতা করেছিলাম অঙ্গিকার।
মায়ের বুক খালি করে নেমেছিলাম রাজপথে,
স্বাধীন চাই বঙ্গভূমি হেকেছিলাম একসাথে।
বঙ্গভূমি সেন্য আমি করিনাকো কাউরে ভয়,
শহীদ ভাইয়ের রক্ত রেঙে বঙ্গভূমি হইল জয়।”
ভারত থেকে আসার পথে ভোলাহাট গীলাবাড়ী ক্যাম্পে চল্লিশ জন নার্সসহ ভর্তি হই। নার্সিং ট্রেনিং করি। রাইফেল ট্রেনিং করে, যুদ্ধহত ভাইদের সেবা করি। গীলাবাড়ী ক্যাম্প মধ্যখানে নদী, নদীর ওপারে আদমপুরে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে চিকিৎসার জন্য আনা হত। এই ক্যাম্পে আমার এক চাচাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক রনাঙ্গনে মাথায় গুরুতর গুলিতে আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করা হয় এবং সুস্থ হয়ে উঠে। এই ক্যাম্পে মুলত, প্রাথমিক চিকিৎসা, যেমন আহতদের কাটা ছেড়া জনিত রক্ত ক্ষরণ বন্ধের ব্যাপারে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ। ছোট খাটো অস্ত্র পাচার ক্ষত স্থানে সেলাই করা, নিয়মিত ড্রেসিং করা, সময়মত ঔষুধ খাওয়ানো, সার্বিক খোজ খবর দেখা শুনা ইত্যাদি সেবা দান করা হয়। আমার ইনস্ট্রাক্টর (কমান্ডার) হাফিজুর রহমান (হাসনু ভাই রহনপুর)। আমার সেক্টর নম্বর ৭ মুক্তি বার্তা নম্বর- ০৩০৩০৪২৫৫। আমার মনে সবসময় একটি জিনিস ব্যাথা দেয়, আমার মন গ্লানিতে, ঘৃণায় ভরে ওঠে ঐ নরঘাতকদের প্রতি মীর জাফরদের প্রতি আমি প্রশ্ন করি, ঐ ফুটফুটে চাঁদের মত, নিষ্পাপ ফুলের মত ঐ শিশু, রাসেলের কি অপরাধ ছিল, সে কি অন্যায় করেছিল, বেঁচে থাকলে হয়ত সে বাবার মত প্রধান মন্ত্রী বা জননেত্রী শেখ হাসিনার মত বাঙালী জাতির মুখে হাসি ফুটাতো দেশ প্রেমিক হয়ে বাঁচত। আমার পিতা মরহুম রমিজউদ্দিন বিশ্বাস দেশে ফিরে এসে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হয়ে নব্বই জন রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের বিচার কার্য পরিচালনা করেন। যুদ্ধ থাকাকালীন গ্রামে যে যে মুক্তিযোদ্ধাদের বাবা মার কাছে গিয়ে বুঝিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ভর্তি করেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন, যুদ্ধের অস্ত্রসস্ত্র উনার কাছে জমা থাকতো অতন্দ্র প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে বাবার অবদান অতুলনীয়। দীর্ঘ নয় মাস ধরে যুদ্ধরত থেকে বিজয়ের বেশে দেশে ফিরে আসি।
“ধন্য মোরা ধন্য, ইতিহাসের সোনার পাতায় মোরা সবার আগেই গন্য”

দ্বিতীয় পর্ব

মুক্তিযুদ্ধ রণাঙ্গানের স্মৃতিকথা
মিসেস কাওসার মহল (পারুল)
বীর মহিলা মুক্তিযোদ্ধা

স্বাধীনতার লাল টুকটুকে সূর্যটাকে পেতে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধে আমরা সবাই ছিলাম মেতে। হঠাৎ পাকবাহিনীর ডিসেম্বরে থেমে গেল রণতূর্য রক্তের নদী বয়ে নিয়ে এলো আমাদের ¯^াধীনতার মূলসূর্য। ১৯৭১ সাল, মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের সব থেকে স্মরনীয় ঘটনা হঠাৎ করে নভেম্বরের শেষের দিকে আমাদের ক্যাম্পে খবর আসলো পাকবাহিনী রাজাকারদের সাথে নিয়ে বলিয়া অপারেশন করে চলে গেছে। সাথে সাথে আমাদের কমান্ডার সাহেব কিছু মুক্তিযোদ্ধা এবং  আমরা বেশ কিছু মহিলা মুক্তিযোদ্ধা গাড়িতে করে ঘটনা স্থলে পৌছালাম। চাপ চাপ রক্ত, সারি সারি লাশ, মনে হচ্ছিল শুধু আকাশে বাতাসে হাই হাই শব্দ। কারবালার রণক্ষেত্র। কোথা থেকে একজন মহিলা এসে আমাদেরকে নিয়ে চলল। বলতে বলতে এখানে পাঁচ জনকে গুলি করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। এখানে সাতজনকে একই কবরে পুতে ফেলা হয়েছে। এখানে ডা. জালালের মরা লাশ পুতা। এখানে বোনের লাশ পুতা। তারা অনেক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, সারি বদ্ধ করে গুলি করেছে। এখন আমার মনে হচ্ছে সেই ৪২ বছর পর বোয়ালিয়া রণাঙ্গনের মাঠে দাঁড়িয়ে আছি। আসার পথে দেখলাম একটি পাঁচ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে বলতে পারে না তার মা বাবার কথা কি করে বেঁচে গেল এই ছেলে? এই ছেলেকে আমরা তুলে নিয়ে চলে আসলাম। সকালে ছেলেটি ক্যাম্পের কাছে ছুটাছুটি, দৌড়া-দৌড়ি করে খেলা করছে। কমান্ডার সাহেব বললেন, এই ছেলে ভবিষ্যততে ডাকাত হতে পারে। তার পরেই থেকে একজন মহিলা এসে বলল, আমাদের কোন ছেলে মেয়ে নাই। এই ছেলেটি আমার চাই। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, বলি এই ছেলে আমি দিব না, আমি মানুষের মত মানুষ করব। কিন্তু বলতে পারেনি, কারণ আমি নিজেই দেশে ফিরে যেতে পারব কিনা জানিনা। জানিনা দেশ স্বাধীন হবে কি হবে না। আমাদের ক্যাম্প এবং মধ্যখানে নদী, নদীর উপারে আদমপুরে মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের ক্যাম্প। আমরা যখন যেতাম সেবার জন্য, তখন দেখতাম আজকে পাঁচজন, কালকে সাতজন, তার পরের দিন ১০জন মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়া গুলি খেয়ে যখম হয়ে কাতরাচ্ছে। আমরা ইনজেকশন করে ব্যান্ডেজ করে, ট্রেসিং করে চলে আসতাম। তারপর, ১১ ডিসেম্বর শীতের মৌসুম বিকাল ৪ টায় মিষ্টি সোনালী রোদ উপভোগ করছিলাম। এমন সময় বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের ট্রাক চলে গেল, আমাদেরকে টা টা দিতে দিতে। তার পরই পরে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা দৌড়াতে দৌড়াতে হাপাতে হাপাতে এসে বলল রহনপুর মুক্ত হয়ে গেছে। শ্রী শ্রী মহন্ত হরি চরনের ঘরে রাজাকারকে মার ধর করা হচ্ছে। “কাল খাসিকে এখনো পাওয়া যায় নি।” ভাইয়েরা বুঝতে পারছেন কালো খাসি কে? গ্রেট রাজাকার। পরবর্তীতে রাজাকারকে তিনটি গুলি করে হত্যা করা হয়। ১২ ডিসেম্বর সকাল ৮ টায় আমাদের কমান্ডার সাহেব, আমরা ৪০ জন মহিলা মুক্তিযোদ্ধা ও বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা, সাথে মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর (চৌডালা) রাজ্জাক সাহেবও সাথে ছিলেন। জানিনা বর্তমানের বেচে আছেন কি না। যখন আমরা মকরমপুর ঘাটে এলাম, সর্ব প্রথম মুক্তিযোদ্ধা সাত্তার সাহেবের বড় ভাই আঃ কাইউম এর সাথে দেখ। ইনি আমাকে দেখে চমকে উঠলেন। বললেন তুমি কোথায় থেকে? কেউ কাউরি খবর জানেনা। বাজারে আসলাম গোটা রহনপুর বাজারে আনন্দ মিছিল করলাম। হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে কমান্ডার সাহেব কে বললাম যাই আমাদের আড়ৎ বাড়ি দেখে আসি। (যেখানে আমি বর্তমানের অবস্থান করছি) এখানে এসে দেখলাম ঘরের সমস্ত জিনিস পত্র ফার্নিচার সব রাজাকার বাহিনী নিয়ে চলে গেছে। এক বিঘতের বেশি জায়গা। শুনলাম পাক ফোজেরা আওয়ামীলীগের লোকেরাকে ধরে ধরে এনে আমাদের বাশ কেটে কেটে বেশ কিছু বাঙ্কার (মরিচা) করেছে। নিচে নেমে দেখার সময় পেলাম না। তার পর রাত ১০ টার দিকে ক্যাম্পে ফিরে গেলাম। তার কয়েদিন পর আমি এবং আমার আব্বা ও মা সহ গাড়িতে করে দেশের বাড়িতে বিজয়ের দেশে ফিলে এলাম। তার বেশ কয়েক দিন পর রহনপুরে এসে আমি আমার চাচত বোন ও বোনে মেয়ে বের হলাম। রহনুপর ষ্টেশন এসে পূর্ণভবা নদীর পাশে বদ্ধ ভূমিতে গেলাম। এখানকার লোকজন বলল, এ বদ্ধভূমিতে পাক ফোজ ও রাজাকারেরা বহু লোক জনকে ধরে গুলি করে হত্যা করেছে। বহু মেয়েকে ধর্ষণ করে ও নির্যাতন করেছে। দেখলাম সামনে একটি বিরাট ব্যাংকার (মরিচা) নিচে নামলাম দেখলাম পাক ফোজদের গাড়ি রাখার জায়গা। পাশে গুলি রাখার দুটি তাকও রয়েছে। তারপর, তারপর, তারপর, বেশ কিছু দীর্ঘ সময় জীবন থেকে ঝরে গেল, হঠাৎ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট শুনলাম বাংলার মাটিতে বাংলার ইতিহাসে জর্ঘন্যতম ঘটনা ঘটে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। শুনে তারপর আমার বাক শূন্য হয়ে গেল। বেশ কিছুদিন যাবৎ আমি খোলামেলা কথা বলতে পারিনি। কি তার অপরাধ ছিল? ১৬ কোটি মানুষকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি করা কি তার অপরাধ ছিল? নিশ্বাপ শিশু রাসেলের কি অপরাধ ছিল। আমি জাতির কাছে জবাব চায়? আমি টকশো তে শুনেছি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমার পিতা আমরা কে যতখানি না ভাল বাসত তার চেয়ে বেশি ভালো বাসতো বাংলার মাটিকে, বাংলার মানুষকে।
এই কি তার অপরাদ ছিল?
তুমি বন্ধু রহমান তুমি মুজিব রহমান
নৌকার, হায়লা, জায়লা
গাড়ির গাড়োয়ান সবাই বলে
মাটির কৃষান সবাই বলে
তুমি বন্ধু রহমান তুমি মুজিব রহমান
বীরঙ্গনা পারুল বলে, বীরঙ্গনা পারুল বলে মুজিব আমারি সন্তান, মুজিব আমারি সন্তান
মুজিব………………………আমারি…………………………সন্তান।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *