Sharing is caring!

Chapai Darpon Comity 2বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আন্দোলনের ফসল চুড়ান্তভাবে গোলায় তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তথা আহবানে সমগ্র জাতি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা হিংস্র হায়নার মত বাঙালি নিধন উৎসবে মেতে উঠে। তাদের কথার মর্মকথা অনেকটায় এইরকম যে, কিরে বেট্যা, আমাদের খাবি, আমাদের পরবি, আমাদের দেশে বাস করবি, আবার উল্টো আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মালায়নদের সাথে বন্ধুত্ব করবি, স্বাধীন হবি, স্বাধীনতা নিবি?। আয় তোর স্বাধীনতার স্বাদ মিটিয়ে দেয়। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বাদ মিটিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তাদের কাছে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু, যুবক-শিশু বয়সের কোন পার্থক্য ছিলনা। বাঙালি হলেই হয়, যা ইচ্ছে তাই করতো পাকিস্তানিরা। কারণ, পাকিস্তান সরকারের প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত চৌকস বাহীনি তারা। বিশ্বজোড়া তাদের একটা তড়িৎকর্মের নাম-ডাক ছিল। গায়ে খাকি পোষাক, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, শিকার হলো নিরিহ বাঙালি, কিসের ভয়, কাকে ভয়, যা মনে লেগেছে, তাই করেছে, তেমনিভাবেই করেছে। শুধু মন চাইলেই হলো, ইচ্ছে হলেই হলো। তবে শিকারটা যেন বাঙালি হয়। ওদের কথাবার্তায় ভাবখানা দেখেশুনে মনে হতো, আমরা বাঙালিরা যেন পাকিস্তানের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে স্বাধীন পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য, দেশ গড়ার জন্য কিছুই করিনি। সুজলা-সুফলা সোনার বাংলা থেকে পাট-চামড়াসহ অন্যান্য সোনার ফসল তারা লুটপাট করে নিয়ে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে, একথা যেন ওদের মনেই পড়েনা। সোনার বাংলাকে দিনে দিনে স্মশান করেছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা, একথা যেন ভাবতেই পারেনা ওরা। নায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করেছে পূর্ব পাকিস্তানকে। চাকুরীর বড় বড় উচ্চ পর্যায়ের পদগুলো সব পশ্চিম পাকিস্তানিরা দখল করেছে। আমাদের যোগ্যতা থাকা সত্বেও শুধু বাঙালি হওয়ার কারণে আমরা অনেক পিছনে পড়েছিলাম ওদের চেয়ে। এসব কথা বুঝতো সবাই, কিন্তু সাহস করে কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেনি। প্রথমে পাকিস্তানিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শুরুটা করেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশব্যাপী গড়ে উঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যানের জন্য নায্য দাবিসমূহ ৬ দফা, ১১ দফা কে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রদ্রোহী বলে উল্লেখ করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। তারপর বাঙালি জাতির দূর্বার আন্দোলন শুরু হয়। “জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো, বাঁশের লাঠি তৈরী করো, বাংলাদেশ  স্বাধীন করো” শ্লোগানে বাংলার আকাশ-বাতাস মুখোরিত হয়। জনতার আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেয় পাকিস্তান সরকার। বীর কখনো মৃত্যুকে ভয় করেনা। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহবান জানা। বাঙালি জাতি, বিশেষ করে যুবকেরা দারুণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সর্বস্তরের নারী-পুরুষ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ শুরু করে। পকিস্তানি সৈন্যরা সে সময় বিশেষ করে যুবকদের খোঁজ করতো এবং ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতো। এদেশীয় কিছু লোক পকিস্তানিদের সহায়তা করেছিল। সেসময় আমরা বয়সে তরুণ, আমাদের চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছিল। আমি কারো কোন কথা শুনবো না, আমি চোখে যা দেখেছি, তাই বলছি, তাই বলবো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় আমরা মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গেলাম। ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে বাঙালি তরুণদের ট্রেনিং হতো। এসব ট্রেনিংপ্রাপ্তদের কোন কোন দলকে মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনী, ফ্রীডম ফাইটার, সাধারণ মানুষ এসব নামে জানতো। কিন্তু আমাদের ছেলেরা ভারত থেকে এসে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করলেই অথবা দেশের মধ্য থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করলেই তাদেরকে ‘মুক্তিফৌজ’ বলতো পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানি সৈন্যদের আমরা তখন পাঞ্জাবী বলতাম, যেমন, পাঞ্জাবীরা ওমুক গ্রাম পুড়িয়ে দিল, পাঞ্জাবী আসছে সব পালা পালা ইত্যাদি। পাঞ্জাবীরা যে কোন গ্রামে ঢুকলেই বলতো ‘মুক্তিফৌজ কিধার হ্যায়’ অথবা মুক্তি কাঁহা হ্যায়? পাঞ্জাবীরা সারাক্ষন আমাদের যোদ্ধাদের মুক্তিফৌজ বলতো। সে সময়ের সমস্ত প্রচার মাধ্যমগুলোও পত্র পত্রিকায় খোঁজ করলে জানা যাবে, মুক্তিফৌজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এবং মা-বোনদের ইজ্জ্বতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের মহান ¯^াধীনতা যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল, তখন থেকে আমাদের বিজয় পরবর্তী সময়ে কখন জানি কেমন করে ধীরে ধীরে মুক্তিফৌজ শব্দটি আমাদের ছেড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি ভোরের সত্য সুন্দর আলোর ন্যায় উদ্ভাসিত হলো বাঙালির চলমান জীবনে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলাতে মুক্তিফৌজ শব্দটি অহরহ ব্যবহার করেছি। যদি আমরা এমনটি ভাবি যে, “ফৌজ” শব্দটি ভিন্ন দেশীয় শব্দ বা আমাদের শত্রæদের ভাষা ছিল, তাই এটিকে আমরা বর্জণ বা পরিহার করছি। কিন্তু এমনটি হলে তো চলবে না, কারণ আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সঠিক ইতিহাস রেখে যেতে হবে আমাদেরকেই। যাদুঘর সমূহে যেমন, অপ্রিয় সত্য অত্যাচারি ব্যক্তি, বস্তু, স্থান সমূহের ছবি বা ঐ সম্পর্কিত তথ্য যতœ সহকারে সংরক্ষন করা হয়, তেমনি ভাবে দিনের আলোর মত উজ্জ্বল মুক্তিফৌজ শব্দটিকে আমাদের সযতেœ সংরক্ষন করতে হবে এবং এটি যে হারিয়ে না যায়, সেব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে মুক্তিফৌজ ও স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতি আমরা সু-বিচার করতে পারবো না। আর সাথে সাথে আগামী দিনের বা বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমরা স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস সংরক্ষনে ব্যর্থ বলে প্রমানিত হবো। তাই আসুন, আমরা সবাই দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, শহীদদের স্বার্থে, সর্বপরি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলোর এই মুক্তিফৌজ শব্দটি যেটি আমাদের শত্রুরা উচ্চারণ করতো, এটিকে আমাদের স্বার্থেই আমরা সংরক্ষন করি।

লেখক : এনামুল হক তুফান   

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *