Sharing is caring!

 

 

image001মো: মনিমুল হক \ একজন বিস্মৃত শহীদ বুদ্ধিজীবী
মোঃ সানাউল হক পিন্টু
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক বুদ্ধিজীবী তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের স্মরণে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসাবে পালন করি। দেশ- মাতৃকার মুক্তির লক্ষ্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে পরিচালিত জনযুদ্ধে মুষ্টিমেয় দালাল ছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহন করেছে। যুদ্ধে অন্যান্য পেশার মানুষ-জনের মত বুদ্ধিজীবীদেরও আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের অগ্রসর অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাঙ্গালী জাতিকে মনন ও সংস্কৃতিগতভাবে তাই পঙ্গু করে দেবার হীন উদ্দেশ্যে পাক সামরিক জান্তা নয় মাসব্যাপি তাদের নিধনযজ্ঞের অন্যতম প্রধান টার্গেট হিসাবে বুদ্ধিজীবীদের বেছে নেয়। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মত চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বুদ্ধিজীবীরা পাকবাহিনীর সীমাহীন বর্বরতা ও পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার হন। রাণীহাটির ডঃ আফতাবউদ্দিন, রাণীবাড়ি-চাঁদপুরের এ্যাডভোকেট জহুরুল হকসহ অনেক বুদ্ধিজীবী প্রাণ বিসর্জন দেন। তবে এক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শহীদ মো: মনিমুল হকের নাম নি:সন্দেহে অগ্রগন্য। নবাবগঞ্জ কলেজের (স্বাধীনতা লাভের পর এটি সরকারীকরণ করা হয়) প্রথম-ভারপ্রাপ্ত অধ্ক্ষ হিসাবে সকলের নিকট তিনি সুপরিচিত ছিলেন। উদার হৃদয়, মুক্ত চিন্তার ধারক এবং রুচিবান, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব হিসাবে সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তিনি ১৯২২ সালে তাঁর পিতার আদি ভিটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভাধীন নামোশংকরবাটির মন্ডলপাড়া মহল্লায় জন্মগ্রহন করেন। মন্ডলপাড়া অনেক বিদ্বান ব্যাক্তির আদিভিটা/ আবাসস্থল হিসাবে সুপ্রসিদ্ধ। তাঁর পিতা মরহুম জনাব মৌ: মো: এমাজ উদ্দিন পেশাগতভাবে একজন প্রথিতযশা উকিল ছিলেন এবং তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের মালদা জেলা শহরে আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। শিষ্টাচারের জন্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় মো: এমাজ উদ্দিন মালদা জেলা বোর্ডের নির্বাচিত এবং স্থানীয় বোর্ডের মনোনীত সদস্য হিসাবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ৮ ভাই ২ বোনের মধ্যে মো: মনিমুল হক ছিলেন ২য় এবং ভাইদের মধ্যে ১ম। চাঁপাইনবাবঞ্জে স্বাধীনতাযুদ্ধের শীর্ষস্থানীয় সংগঠক ও পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মো: সেরাজুল হক শনি মিয়া (প্রতিবেদকের পিতা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রীডার ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিক্ষা সরঞ্জাম বোর্ডের মহাপরিচালক ড. মো: বজলুল হক, পূর্ব পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন সার্ভিসের উপ-পরিচালক, পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো: আইনুল হক, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, এিপোলি এবং ঢাকার এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক ড. মো: রশিদুল হক এবং ইংল্যান্ড প্রবাসী মো: আজিজুল হক-সকলেই তাঁর ভাই ছিলেন। তাঁর অন্য দুই ভাই শৈশবেই মারা যান। মো: আতাউর রহমান যিনি প্রথম বাঙালি পধৎববৎ ফরঢ়ষড়সধঃ হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পূর্বেই প্রতিকূলতা সত্তে¡ও পাকিস্তানের রাট্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালনের বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন, তিনি তাঁর ছোট ভগ্নিপতি ছিলেন। মো: মনিমুল হক তাঁর আপন চাচাত বোন নাসেহা খাতুনের সাথে ১৯৪৩ সালে পরিণয়সূএে আবদ্ধ হন। মনিমুল হক- নাসেহা দম্পতির ৪ সন্তান। এদের মধ্যে বড় ছেলে মো: মইনুল হক চন্দন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৬৯ সালে সমাজকর্ম বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৭০ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮ সাল হতে তিনি কানাডা-প্রবাসী। মাঝে-মধ্যে দেশে আসেন। ছোট ছেলে নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজের সাবেক জি.এস. ও ভি.পি. মো: মজিবুল হক বাবুল মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার সাদাত একাডেমি অব ম্যানেজমেন্ট হতে ১৯৮০ সালে ব্যাবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। মিশরে দীর্ঘ দিন চাকুরীরত ছিলেন। ২০০০ সাল হতে দেশেই বসবাস করছেন। বড় মেয়ে নাসিমা খাতুন ৮/১২/২০১০ এবং ছোট মেয়ে আনিসা হক ২০/৯/২০১৩ খ্রিঃ তারিখে পরলোক গমন করেন। পিতার উপরোক্ত পেশার সূত্রে মো: মনিমুল হক মালদা জেলা শহরে বসবাস করতেন। সেখানকার অক্রোমনি হাইস্কুল থেকে তিনি ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৪৪ সালে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে বি.এ পাশ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে মো: মনিমুল হক পাকিস্তান সরকারের অধীনে সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট (বর্তমানে খাদ্য দপ্তর)-এ চাকুরীতে যোগ দেন। নবাবগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৫৫ সালে সরকারী চাকুরী ত্যাগ করে এ কলেজের সহ-অধ্যক্ষ এবং প্রথম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে কাজে যোগদান করেন। কলেজকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেন। প্রথম অবস্থায় ছাত্র সংগ্রহের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে নৌকা ও গরু-গাড়ীযোগে অভিভাবকদের বাসায় হাজির হতেন এবং তাদের ছেলেমেয়েদের কলেজে ভর্তির জন্য উদ্ধুদ্ধ করতেন। ছাত্রদের জন্য লজিংয়ের ব্যবস্থা করতেন। ১৯৭০ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১টি নৈশ কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তিনি গ্রহন করেন। চন্ডীমন্ডপ স্কুলে ক্লাসও শুরু হয়। কিন্তু তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর উক্ত কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ আর এগোয়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাঠাগার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্লাব ইত্যাদি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। ফুলের চাষ, মাছ চাষ, মাছ শিকার, গ্রামোফোন ও বেতারে গান শোনা, ক্রিকেট খেলার ধারা-বিবরণী শোনা, বই বিশেষত ইতিহাস গ্রন্থ ও উপন্যাস পড়া, ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন এবং পরিবার-পরিজনদের নিয়ে বনভোজনে যাওয়া ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। তবে বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলনকে মনে-প্রাণে সমর্থন করতেন। ’৭০ এর নির্বাচনে নৌকায় ভোট দেবার জন্য পরিচিতজনদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ’৭১ এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ২৬ মার্চ রাতেই তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ এবং মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা ইপিআর ক্যাম্পে অবস্থানরত পাক বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করেন (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র; নবম খন্ড দ্রষ্টব্য)। চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্বাধীনতা যুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ৫-সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়, যার অন্যতম সদস্য ছিলেন মনিমুল হকের ছোট ভাই বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম মোঃ সেরাজুল হক শনি মিয়া (দুর্ভাগ্যজনকভাবে  মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে তিনি এখনো কোন সরকারী ¯^ীকৃতি পান নি)। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন আলহাজ মোঃ রইস উদ্দিন আহমদ, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য; ডা.আ.আ.ম. মেসবাহুল হক, তখনকার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য; ভাষা-সৈনিক ও ন্যাপ নেতা এ্যাডভোকেট মো: গোলাম আরিফ টিপু এবং বিশিষ্ট বাম-নেতা ও ভাষা-সৈনিক এ্যাডভোকেট ওসমান গণি। পরে সদস্য সংখ্যা ১০ এ উন্নীত করা হয়। দু’ভাই একই বাড়িতে বাস করতেন। তাদের বাড়িতেই প্রতি দিন স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হত। ছোট ভাইয়ের নিকট হতে মো: মনিমুল হক উৎসাহের সাথে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি বিশেষতঃ মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য বিষয়ে খোঁজ খবর নিতেন। ১৯ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর পুনরায় পাকবাহিনীর করায়ত্ব হলে তারা দু’ভাই-এর বাড়ি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মো: মনিমুল হক প্রথমে মহারাজপুরে তাঁর মামা টানু মোড়ল, পরে বামুন গাঁ- চৈতন্যপুরে তাঁর বড় ভগ্নিপতি বিশিষ্ট জোতদার ইসরাইল মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মাঝে বেশ কিছু দিন বিমড়ষি গ্রামে টুগু মাস্টারের বাড়িতে ছিলেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভারত গমনের ক্ষণ যেদিন চুড়ান্ত সেদিনই বিকেলে মহারাজপুরের নজরুল ইসলাম সোনার নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দালালরা চৈতন্যপুরে তাঁর অপর ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হক মাষ্টারের বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে। সেখান থেকে তাঁকে নবাবগঞ্জ ও নাটোর হয়ে ঢাকায় নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে আটক রাখা হয়। সেখানে তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ঢাকায় অবস্থানরত তাঁর অপর ভাই ডঃ মো: বজলুল হক মাঝে-মধ্যে তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন। অক্টোবরের ২০ তারিখে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ’তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী নন, সম্পূর্ন নির্দোষ’- এ মর্মে তাঁকে ডযরঃব ঈবৎঃরভরপধঃব- ও দেয়া হয়। তাতে তাঁর শঙ্কা কাটেনি। সামরিক জান্তার চাপে অনিচ্ছা সত্বেও কর্মস্থলে যোগ দিলেও ভারতে অবস্থানরত তাঁর দু’ভাই মোঃ সেরাজুল হক এবং প্রফেসর ডঃ রশিদুল হক এর কাছে খবর পাঠান, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত কোন অবস্থাতেই তারা যেন দেশে ফিরে না আসেন। তাঁর  দুই পুত্র সন্তান যারা তাঁর গ্রেপ্তারের দিনই ভারতে পাড়ি জমান এবং তাঁর মেজো ভাইয়ের কাছে আশ্রয় লাভ করেন, তাদেরও তিনি দেশে ফিরে আসতে নিষেধ করেন। তারাও ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত তাঁর মেজ ভায়ের আশ্রয়ে থাকেন। পরিচিতজনদের কাছে প্রায়ই শঙ্কা ব্যক্ত করতেন তাঁকে যে কোন সময় মেরে ফেলা হতে পারে। তাঁর আশংকা অচিরেই সত্যে পরিণত হয়।’ ৭১ এর ১৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯ টায় বাইরে থেকে তাঁকে ডাকা হয়। দরজা খুলে দেখেন পাক বাহিনীর ৪ জন সহযোগী দন্ডায়মান। সকলের পরনে লুঙ্গি-শার্ট, মুখ মাফলার দিয়ে আধা-ঢাকা। তারা জানায় জরুরী প্রয়োজনে তাঁকে তখনই তাদের সাথে থানায় যেতে হবে। অন্যথায় তাঁর বিপদ হবে। ঘটনার ভয়াবহতা তিনি উপলদ্ধি করতে সক্ষম হন। তিনি বাড়ির ভিতরে এসে শার্ট-প্যান্ট, ঘড়ি পরিধান করেন; চশমা, টর্চ এবং ১০০ টাকা হাতে নেন এবং তাঁর মা আলহাজ এফরাতুন্নেসার সামনে গিয়ে দাড়ান। এ সময় তিনি ওযু করছিলেন। তাকে জড়িয়ে ধরে শুধু বলেন, “মা আমার জন্য দোয়া করিস।’’ এ কথা বলেই স্ত্রী-কন্যাদের কান্নার মধ্যেই তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন।  থানায় মেজর শেরওয়ানীসহ অন্যরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। সে রাতেই তাঁকে জীপে করে রাজশাহীতে নেয়া হয়। সকালে কর্ণেল রিজভীর সামনে হাজির করা হয়। তিনি তাঁকে অভিযুক্ত করে বলেন যে, তিনি তাঁর দুই ছেলেকে মুক্তিবাহিনীতে পাঠিয়েছেন, তাঁর মেজো ভাই মুক্তির নেতা, তিনি আওয়ামী লীগ করেন, স্বরসতী পূজায় কলেজ ফান্ড থেকে হিন্দুদের চাঁদা দিয়েছেন ইত্যাদি। আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি কিছু বলতে চাইলে কর্ণেল রিজভী তাঁকে থামিয়ে দিয়ে রাগত স্বরে জানান যে, ইতোমধ্যেই তাঁর বোর্ড হয়ে গেছে। তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। তিন দিন পর তাঁকে ংযড়ড়ঃ করা হবে। তিনি আরো জানান, রুহুল আমিন (নামোশংকরবাটির)সহ অন্য ক’জনার কাছ থেকে তাঁর আওয়ামীলীগ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধপ্রীতি সম্পর্কে তারা তথ্যাদি পেয়েছেন। এসব কথার পর তাঁকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নীচ তলার একটি কক্ষে তাঁকে ২ দিন অভূক্ত অবস্থায় অন্তরীণ রেখে ৩য় দিন চার সিটবিশিষ্ট ব্লকের তিন তলার অন্য একটি কক্ষে নেয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অন্তরীণ ছিলেন জনাব মো: কসিম উদ্দিন (বিএনপি নেতা মরহুম এ্যাডঃ সুলতানুল ইসলামের পিতা-বর্তমানে প্রয়াত) এবং প্রাক্তন এম, এন-এ মরহুম রইস উদ্দিনের কনিষ্ঠ ছেলে। তাদের তিনি সব ঘটনা সবিস্তারে খুলে বলেন। উৎকন্ঠার মধ্যে কয়েক দিন অতিবাহিত হবার পর ২০ নভেম্বর অর্থাৎ ’চাঁদ রাতে (শাওয়াল মাসের প্রথম চাঁদ দেখা রাতে)’ ২ টার সময় পাক ফৌজের ঘাতক দল তাঁর কক্ষে উপস্থিত হয়। তাঁর নাম-ধাম সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তাঁকে কক্ষর বাইরে নিয়ে যায়। তাঁর চোখ কালো কাপড়ে এবং হাত দুটো পেছনে পিঠমোড়া করে বেঁধে অন্যান্য ১০ জন হতভাগ্যের সাথে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয় যেখান থেকে তিনি আর কোন দিনই ফিরে আসেননি। তাঁকে ধরে নিয়ে যাবার প্রায় আধা ঘন্টা পরে তাঁর কক্ষে অন্তরীণ অন্যান্য সহবন্দীগণ দূর থেকে ভেসে আসা ব্রাশ ফায়ারের গুলির ক্ষীণ শব্দ শুনতে পান এবং স্তব্ধ হয়ে পড়েন। তাঁর বড় মেয়ে নাসিমা হক (বর্তমানে প্রয়াত) অশ্রুসজল চোখে এ প্রতিবেদককে বলেন “পাকিস্তানীরা নাকি মুসলমান। চাঁদ রাতে মানুষ মারতে ওদের হাত কাঁপলো না!” ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়ে মোঃ কসিম উদ্দিনই প্রথম মো: সেরাজুল হক শনি মিয়াসহ মো: মনিমুল হক-এর পরিবারকে ’চাঁদ-রাতে’ তাঁর মৃত্যু এবং মৃত্যুপূর্ববর্তী ঘটনাবলী সম্পর্কে সবিস্তারে অবহিত করেন এবং মো: মনিমুল হক এর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বন্দী অবস্থায় তাঁর ব্যবহৃত সোয়েটার, চশমা, হাতঘড়ি ও টর্চ এবং টাকা তাঁর পরিবারবর্গকে পৌঁছে দেন। তাঁর ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, ¯^জন ও শুভানুধ্যায়ীরা শহীদ শামসুজ্জোহা হলের পাশে ইটের ভাটা, কাটাখালী ছাড়াও রাজশাহী, নাটোরের সকল বধ্যভূমি, গণকবর এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাঁকে মৃত বা জীবিত উদ্ধার করতে পারেন নি। শহীদ মো: মনিমুল হকের মৃত্যুর প্রকৃত তারিখ নিয়ে কারো কারো মনে সামান্য বিভ্রান্তি রয়েছে। এ জন্য অবশ্য তাদের মোটেও দায়ী করা যাবে না। যা হোক, এ বিভ্রান্তি সত্বর দূর হওয়া আশু প্রয়োজন। মোঃ কসিম উদ্দিন, মো: মনিমুল হকের স্ত্রী নাসেহা খাতুন (বর্তমানে প্রয়াত), তাঁর বড় মেয়ে নাসিমা খাতুন, ছোট মেয়ে আনিসা হক-সকলেই জানান যে, নভেম্বর মাসে চাঁদ-রাতে ২টার পরে তিনি শহীদ হন। প্রথমোক্ত ২জন সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেন নি। (১৯৯৮ সালে) আনিসা হক উল্লেখ করেন যে, সম্ভবত সেদিন ছিল ২৭ নভেম্বর (১৯৭১ সাল)। তার এ কথার সূত্র ধরেই কোন কোন প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যু-দিবস ২৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে এবং উক্ত তারিখ তাঁর মৃত্যু-দিবস হিসাবে পালন করা হচ্ছে। তবে নাসিমা খাতুন দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, সে দিন ছিল আসলে ২০ নভেম্বর। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায় যে, আলোচ্য ’চাঁদ-রাত’ ছিল ২০ নভেম্বরে, ২৭ নভেম্বরে নয়। কাজেই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মো: মনিমুল হক ২০ নভেম্বর দিবাশেষে রাত ২ টার পরে শহীদ হন। যেহেতু তিনি রাত ১২ টার পর মারা যান সে অর্থে তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর তারিখ হচ্ছে ২১ নভেম্বর (১৯৭১ সাল), পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিন।
জনাব কসিম উদ্দিনের সামনে প্রদত্ত শহীদ মনিমুল হকের বক্তব্যের সূত্র ধরে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই কর্ণেল রিজভি, মেজর শেরোয়ানী, রূহুল আমিন এবং তিন জন শিক্ষকের বিরূদ্ধে নবাবগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন সরকারের সিস্পৃহতার কারনে মামলাটি ধামা-চাপা পড়ে যায়। তাঁর নির্মম হত্যাকান্ডের কোন বিচারও হয়নি। মো: মনিমুল হক দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। কিন্তু মাত্র কিছুদিন আগে পর্যন্তও তাঁর প্রতি অবহেলার অন্ত ছিল না। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নামে কলেজ ও সড়ক সেতু হয়েছে। শহীদ সাটুর নামে বিডি হলের নতুন নামকরণ হয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগ, সবুজ সংঘসহ সর্বস্তরের জনগনের দাবী সত্তে¡¡ও আজ পর্যন্ত তাঁর নামানুসারে নবাবগঞ্জ কলেজের নামকরণ করা হয়নি। ১৯৭৪ সালে ছাত্র সংসদের দাবীর প্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নিদেন পক্ষে তাঁর নামে ১টি আধুনিক হোস্টেল নির্মাণ এবং কলাভবনের নামকরণ করা হবে। তাও করা হয়নি। ১৯৭৯-৮০ সালে ছাত্র সংসদ কর্তৃক তাঁর নামানুসারে বিদ্যমান হোস্টেলের নামকরণের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তাতে কোন কাজ হয়নি। উপরোক্ত বিদ্যমান হোস্টেল ছাড়াও পরবর্তীতে একটি নতুন হোস্টেল নির্মাণ করা হয়েছে। সেটির-ও নামকরণ তাঁর নামানুসারে হয়নি। তবে দেরিতে হলেও ক্রমাš^য়ে গৃহীত কিছু সুবিবেচনা প্রসূত প্রশংসনীয় কার্যক্রম শহীদ মনিমুল হকের প্রতি প্রদর্শিত অবহেলা নিরসনে অনেকটাই যেন সহায়ক হয়েছে। ১৯৮৯ সালে নবাবগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারন সম্পাদক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রাক্তন কমিশনার শেখ খাবির উদ্দিন ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহন করায় এবং উক্ত উদ্যোগকে তৎকালীন চেয়ারম্যান সমর্থন করায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা শহীদ মনিমুল হকের বাসভবন হতে নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ পর্যন্ত ৪৫০ মিটার দীর্ঘ সড়কটি তাঁর নামানুসারে নামকরণ করে। ১টি নামফলকও স্থাপন করা হয়। ফলকটি দীর্ঘদিন ধরে মাটিতে গড়াগড়ি খাবার পর অবশেষে স¤প্রতি সেটি সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়েছে। প্রফেসর সুলতানা রাজিয়া ২০১১ সালে নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব গ্রহনের পর উক্ত সাল হতেই তার এবং মূলত কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক-ছাত্রদের সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহনের ফলে শহীদ মনিমুল হকের মৃত্যু দিবস কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হচ্ছে। এছাড়াও ২০১১ সালে অধ্যক্ষ সুলতানা রাজিয়াকে আহবায়ক এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক সাইদুর রহমান প্রমূখদের সদস্য করে গঠিত মো: মনিমুল হক স্মৃতি সংসদ কর্তৃক তাঁর মত্যু-বার্ষিকী প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। সর্বোপরি অধ্যক্ষ সুলতানা রাজিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহনের ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা  অধিদপ্তরের অর্থায়নে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত¡াবধানে কলেজ কমপ্লেক্সে একটি নতুন এগজামিনেশন ও একাডেমিক ভবনের নির্মাণ কাজ ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে সম্পন্ন করা হয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যেই একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। অধ্যক্ষের ইচ্ছা ও প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কলেজের একাডেমিক কাউন্সিল স্বতস্ফূর্তভাবেই ভবনটি শহীদ মনিমুল হকের নামানুসারে নামকরণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ভবনটির নামফলকে তা উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত সিদ্ধান্তের অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দেরীতে হলেও উক্ত মহতী কাজের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ, এর ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ এবং মাননীয় সরকার-সকলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসীর প্রশংসা ভাজন হবেন। শহীদ মনিমুল হকের স্মৃতি রক্ষার্থে এবং তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা প্রদানের জন্য বিশেষ করে অধ্যক্ষ সুলতানা রাজিয়া যে ভূমিকা পালন করেছেন তার জন্য তিনি স্মরনীয় হয়ে থাকবেন। শহীদ মোঃ মনিমূল হক আজ আর আমাদের মাঝে নেই।…………… তবে, তাঁর আত্মত্যাগ আমাদেরকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে এবং দূর্ণীতি, নিপীড়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সুখী, সমৃদ্ধশালী, অসা¤প্রদায়িক, আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *