Sharing is caring!

godagari photo-14-05-16সফিকুল ইসলাম, গোদাগাড়ী থেকে \ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ ‘রাসেল ভাইপার’ নিয়ে এখনো আতঙ্ক কাটছেনা কৃষকসহ সাধারণ মানুষের। বোরো ধান কাটার সময় ‘রাসেল ভাইপার’ এ আঞ্চলে দেখা মিলে বেশী। এই বিষধর সাপকে চঁন্দ্রো বোরা বা আইল বোরা নামে চিনে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। ‘রাসেল ভাইপার’ এর বৈশিষ্ট লেজের উপর ভর করে চলতে পারে। এমনকি মানুষকে তেড়ে গিয়ে কামড়ায়। কামড় দেওয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যাক্তি অচেতন হয়ে যায়। এ সাপের গর্জন খুব ভয়ঙ্কর। এ অঞ্চলে সাপের কামড়ে কারো মৃত্যু হলে মনে করছে ‘রাসেল ভাইপার’ সাপে কামড়িয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের কাছে আতঙ্কের বিষয় হয়ে উঠেছে রাসেল ভাইপার। আতঙ্কের ফলে কৃষি শ্রমকিরা জমিতে ধান কাটতে চাচ্ছেনা। দ্বিগুন মজুরী দিয়েও পাওয়া যাচ্ছেনা কিছু কিছু এলাকায় ধান কাটা শ্রমিক। এ মৌসুমে ইতিমধ্যে দুজনের প্রাণ নিয়েছে রাসেল ভাইপার। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দুইজন। দীর্ঘ ২৫ বছর বিলুপ্ত থাকার পর ২০১৩ সালে হঠাৎ এ সাপটির দেখা মিলে এ অঞ্চলে। ওই বছরই ভয়ঙ্কর এ সাপটি তিনজনের প্রাণ কেড়ে নেয়। এরপর থেকে নিয়মিত প্রাণসংহার করে যাচ্ছে এই সাপ। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, রাসেল ভাইপার যে মানুষকে কামড়ায় তাকে বাঁচানো খুবই কষ্টকর। কিডনি খুব দ্রুত আক্রান্ত হয় এ সাপের কামড়ে। অনেক সময় রাসেল ভাইপারের বিষ নিস্ক্রিয় করা গেলেও কিছুদিন পর দংশিত স্থানে পচন ধরে। তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওই রোগী মারা যান। এলাকাবাসী ও রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই জনকে কামড় দেয় এই সাপ। একজন হলেন সদর উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের মানিক মিয়ার ছেলে মেহেদি হাসান (১০)। সে বর্তমানে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মেহেদির ¯^জনরা জানান, বিকেলে মেহেদি মাঠে ঘাস কাটতে যায়। এসময় তার বাম পায়ে কামড়ায় রাসেল ভাইপার। ওই দিন তাকে স্থানীয় ওঝার ঝাড়ফুঁক দেওয়া হয়। ওই রাতেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সকালে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে রামেক হাসপাতালে রেফার্ড করেন। অপর জন হলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার জামাইপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে বাবু (৮)। সে বর্তমানে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। গত মার্চ মাসে রাজশাহীর পবা উপজেলার গহমাবুনা গ্রামের কৃষক গোলাব হোসেনকে এ সাপে কামড়ালে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর এখনো বেঁচে থাকলে সে পুরপুরি সুস্থ হয়নি। গত ২৭ এপ্রিল রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা গ্রামের কৃষক নাইমুল ইসলামের (২৫) রাসেল ভাইপারের কামড়ায় এবং গত ৩ মে তার মৃত্যু হয়। জানা গেছে, সে ধানের জমিতে কাজ করছিলেন। এ সময় তাকে রাসেল ভাইপারে কামড়ায়। গত ২১ এপ্রিল একই গ্রামের মৌসুমী খাতুন নামে আরেক নারীকে রাসেল ভাইপার কামড়ায় এবং ২৯ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। সে বিকেলে ধানি জমির আইলে ছাগল চরাতে গেলে তাকে বিষাক্ত এই সাপ কামড়ায়। নিমতলা গ্রামের সামাদ জানিয়েছেন, গত বছর থেকে তাদের এলাকায় এ সাপ দেখা যাচ্ছে। গত বছর নদীতে জেলেদের জালে প্রথম একটি রাসেল ভাইপার আটকা পড়ে। খবর দেওয়া হয় রাজশাহী চিড়িয়াখানায়। সেখানকার কর্মকর্তারা বলেন, এমন ভয়ঙ্কর সাপ তাদের চিড়িয়াখানায় রাখার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে জালসহ সাপটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। মাস দুয়েক পর আরেকটি সাপ এলাকার এক ব্যক্তিকে তাড়া করলে কৌশলে সাপটি ধরে তারা রামেক হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এটিই ভয়ঙ্কর রাসেল ভাইপার। এদিকে চলতি মৌসুমে রাসেল ভাইপারের কামড়ে দুজনের মৃত্যু এবং আরো একজন হাসপাতালে ভর্তি থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে। বোরো ধান কাটতে গিয়ে দুরুদুরু করছে তাদের বুক। রাসেল ভাইপারের কারনে বোরো ধান কাটতে চাইছেনা অনেক শ্রমিক। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১ জুন/১৪ নওগাঁর ধামইড় হাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন গ্রামের জামার নামের এক কৃসককে এই সাপে কামড়ালে রামেক হাসপাতালে ৮ দিন চিকিৎসার পর তিনি মারা যান। জুলাই/ ১৪ চাপাই নবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বরেন্দ্রা গ্রামে আব্বাস আলীর ছেলে আক্কাসের (১৮) হাতের আঙ্গুলে কামড় দিলে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসার পর সে মারা যান। ২৪ নভেম্বর/ ১৪ রাজশাহীর তানোর উপজেলার শিবরাম পুর গ্রামের নওসাদ আলীর ছেলে তজিমুদ্দিনকে (২৫) কামড়ালে সে মারা যান। ১৫ অক্টোবর/১৫ ইং রাজশাহীর তানোর উপজেলার সাইধাড়া গ্রামের কৃষক ইয়ামিন কালু এ সাপের কামড়ে মারা যান। গত বছর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মোল্লাাপাড়া গ্রামে  বিপ্লব (২০) এবং সাহেব আলী (৫৫) নামে দুজনের মৃত্যু হয় এই সাপের কামড়ে। গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা গ্রামের পিয়ারুর বলেন, এ বছর তাদের গ্রামে মারা গেছেন দুজন। গত বছর পাশের গ্রামের দুই জন এই সাপের কামড়ে মারা গেছে বলে এ গ্রামের কয়েক জন জানাই। এ গ্রামে ‘রাসেল ভাইপার’ এখন তাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। অনুসন্ধানে আরো জানা যায, ১৯৮৫ সালের দিকে এ অঞ্চলে ‘রাসেল ভাইপার’ সাপটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৩ সালের দিক থেকে আবারো হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে ভয়ঙ্কর বিষধর এই সাপ। ওই বছর জার্মানির আন্তর্জাতিক বিষ গবেষণা কেন্দ্রের একটি দল গবেষণার জন্য এসে রাজশাহীর তানোর উপজেলা থেকে দুটি রাসেল ভাইপার ধরে নিয়ে যায়। এর একটি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তৎকালীন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আজিজুল হক আজাদ নিজের কাছে রাখেন। ‘রাসেল ভাইপার’ সাপের কামড়ের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে কৃসকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করতে শুরু কলে। কৃষকদের এ আতঙ্ক দূর করতে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নিমতলার পাশের গ্রাম কুমরপুরে গোদাগাড়ীর ইউএনও খালিদ হোসেনের সভাপত্বিতে ‘সাপ ও সাপের দংশন, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা’ বিষয়ক জনসংলাপের আয়োজন করেছিল উপজেলা প্রশাসন ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিক। সেখানে রাসেল ভাইপারের দংশনের পর করণীয় নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অশোক ফাউন্ডেশনের ফেলো এবং বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আবু সাইদ বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিষধর তিন প্রজাতির সাপের মধ্যে রাসেল ভাইপার একটি। দুই থেকে তিন ফুট লম্বা এই সাপটি বেশিরভাগ সময় গর্তেই ঘাপটি মেরে থাকে। তবে খিদে পেলে এটি ইদুর ও ঘাস ফড়িং জাতীয় বিভিন্ন পোকামাকড় শিকারের জন্য বের হয়। সাপটির মাথার দিক অনেক চিকন এবং ছোট হওয়ায় দ্রুত গতিতে সে মানুষকে দংশন করতে পারে। অন্যান্য সাপের চেয়ে এটির দাঁতও বেশ বড়। একবার কামড়েই ২৬০ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করতে পারে। তবে মাত্র ৪০ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করতে পারলেই মানুষের মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তৎকালীন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আজিজুল হক আজাদ বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগে বরেন্দ্র অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই সাপ। এরপর ২০১৩ সালে আবারো দেখা মিলেছে এই সাপের। অত্যন্ত বিষধর এই সাপে কামড়ালে অনেক সময় চিকিৎসা দেওয়ার মতো সময় পাওয়া যায় না। সাপে কামড়ার কিছু সময়ের মধ্যেই রোগীর রক্ত জমাট বাঁধে। আবার সঠিক চিকিৎসায় রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পরও দংশিত স্থানে পচনের সৃষ্টি হয়ে রোগী মারা যাওয়ার নজিরও আছে। ধানের ক্ষেতে বা চর অঞ্চলে গেলে গাং বুট পরে যাওয়া উচিৎ। সাপে কামড়ালে ওঝা বা কবিরাজ দিয়ে ঝাড় ফুক না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া উচিৎ বলে তিনি আরো জানাই। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, রাসেল ভাইপারের কামড়ের রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি যন্ত্র রয়েছে। বাংলাদেশে শুধু রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই গত বছর এ যন্ত্রটি দেওয়া হয়েছে। তবে যন্ত্রটি চালানোর জন্য প্রতি ৭২ ঘণ্টায় ১টি করে সার্কিট প্রয়োজন। যার প্রতিটির দাম ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সরকারিভাবে এ সার্কিটের কোনো সরবরাহ নেই।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *