Sharing is caring!

DSC03394স্টাফ রিপোর্টার \ ১৪ ডিসেম্বর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত দিবস। শহীদ বুদ্ধিজীবি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত দিবস উপলক্ষে সোনামসজিদে নানা কর্মসূচীর ম্যধ্য দিয়ে আজ সোমবার শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ৪৪ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা মৃক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড এসব কর্মসূচীর আয়োজন করে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও শহীদ মেজর নাজমুল হক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও মাগফিরাত কামনা, আলোচনা সভা ও গণকবর জিয়ারত। জেলা ইউনিট কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধূরী (বীরবিক্রম)। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ এনামুল হক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ গোলাম রাব্বানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর কবীর, পুলিশ সুপার বশির আহম্মদ পিপিএম, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মঈনুদ্দিন মন্ডল, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব রুহুল আমিন। এসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও উপজেলা ইউনিট কমান্ডের মুক্তিযোদ্ধাগণ ও বিভিন্নস্থানের মুক্তিযোদ্ধাগণ উপস্থিত থাকবেন। ১৪ ডিসেম্বর বাংলা মায়ের দামাল সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের এই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পার্শ্বে মহানন্দা নদীর তীরবর্তী গ্রাম রেহায়চর এলাকায় সংগঠিত হয় এক রক্ত¶য়ী যুদ্ধ। পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সুম্মুখযুদ্ধে ধ্বংস করে দেয় শত্রæ বাহিনীর ১৮টি ট্রেঞ্চ ও ২০ থেকে ২২ টি বাংকার। শত্রæমুক্ত হয় চাপাইনবাবগঞ্জ। তবে, ১৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত দিবস বলছেন জেলা ইউনিট কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে তৎকালিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার অন্যান্য এলাকা মুক্ত হয়ে গেলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ছিল পাক হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় শত্রুসেনাদের দখলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে। ১৩ ডিসেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর শহর মুক্ত করতে কয়েকটি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রেহায়চর এলাকায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। সম্মুখযুদ্ধে একের পর এক পরাস্ত করতে থাকেন শত্রু বাহিনীকে। ১৪ ডিসেম্বর রাতের আধার কেটে সকালে সূর্য ওঠার আগেই নির্ভিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জাহাঙ্গীর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে চলেন এবং ধ্বংস করে দেন শত্রæ বাহিনী ১৮টি ট্রেঞ্চ ও ২০ থেকে ২২ টি বাংকার। জাহাঙ্গীরের দুসাহসিক ও দুরন্ত আক্রমণে শত্রæ বাহিনী তাদের আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। রেহায়চর ঘাটের কাছেই শত্রæ বাহিনীর সর্বশেষ বাংকারটি দখল করতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এগোতে থাকার সময় হটাৎ শত্রæ বাহিনীর একটি গুলি এসে লাগে বীরশ্রেষ্ঠে জাহাঙ্গীরের কপালে। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে বাংলার এই বীর সন্তান এবং সেখানেই শাহাদাত বরণ করেন। পরের দিন শহীদ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরকে দাফন করা হয় হযরত শাহ নেয়ামাত উল্লাহ (রহঃ)-এর পুণ্যভূমি বাংলার পুরাতন রাজধানী গৌড়ের সোনামসজিদ চত্বরে। এরপর আর কোন যুদ্ধ হয়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। মুক্ত হয়ে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তবে ১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত হলেও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে নবাবগঞ্জ কলেজ মাঠে মুক্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ১৫ই ডিসেম্বর। সেই হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত দিবস বলছেন জেলা ইউনিট কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম।  চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করতে গিয়ে শহীদ হওয়া এই বীর সন্তানের নামে পরবর্তীতে ২টি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। মহানন্দা নদীর উপর নির্মিত ব্রীজটির নামকরণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু। ব্রীজ চত্বরে বারঘরিয়া নামক স্থানে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতি স্তম্ভও তৈরী করা হয়। একটি পিস্তুলের উপর ২টি শান্তির পায়রা খঁচিত স্তম্ভটি কালের সাক্ষি হয়ে থাকবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। অনেক পরে হলেও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের শহীদ স্থলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মান করা হয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ঠিক দু’দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রæ মুক্ত করতে গিয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন। প্রতি বছর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটসহ শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে ঐতিহাসিক গৌড়ের ছোট সোনামসজিদ প্রাঙ্গনে অবস্থিত মাজার চত্বরে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ৭ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কমান্ডিং অফিসারগণ এই দিনে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসেন সেখানে। সেই ভয়াল দিন গুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁদের অনেকেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ প্রজন্মের তরুণরা জানতে পারে, এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সেই করুণ ইতিহাস। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ১৯৪৯ সালে বরিশালের রহিমগঞ্জে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে মুলাদী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবং ১৯৬২ সালে মুলাদী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্ট পুলে জুনিয়ার বৃত্তি লাভ করেন। একই বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে গণিতে লেটার মার্কসহ এসএসসি পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আবারো গণিতে লেটার মার্কসহ এইচ এসসি পাশ করেন। এর পর তিনি ‘৬৭ সালের ৫ অক্টোবর কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে যোগদান করেন। নিষ্ঠার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৮ সালের ২ জুন কমিশন প্রাপ্ত হন। ৬ মাস চাকুরী করার পর তিনি রিসালপুরস্থ মিলিটারী কলেজ অভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যোগদান করেন এবং ১৩ মাসের ব্যাসিক কোর্সে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ন হন। এরপর সেখান হতে বোম্বে ডিস্পোজাল কোর্স করেন এবং কোর অব ইঞ্জিনিয়ারর্স এর একজন সুদক্ষ অফিসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সুনাম অর্জন করেন। ‘৭১ এর ২৫ মার্চ কাল রাত। পাক হানাদার বাহিনী অতর্কিতে ঢাকাসহ সারা দেশে ইতিহাসের সব চেয়ে বর্বরচিত হামলা চালিয়ে নিরিহ নিরস্ত্র বাঙালি নিধন শুরু করে। শুরু হয় পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম। পাক হানাদার বাহিনী তাদের দোষর আলবদর, আল সামস আর রাজাকারের সহযোগিতায় গণ হত্যায় মেতে ওঠে। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তখন পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ‘৭১-এর এপ্রিল মাসে একবার তিনি ছুটি পান। ছুটি পেয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর বোনের বাসায় ওঠেন। সেখানে বসে বাংলাদেশে গণহত্যা, নারী ধর্ষণসহ ভয়াবহ অবস্থার কথা ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসি রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন। দেশের জন্য চিন্তা করে বিচলিত হয়ে পড়েন। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। খোঁজ পান আনম, শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন (বীর উত্তম), মেজর (অব) শাহরিয়ারসহ আরো ৩ বাঙালি সেনা কর্মকর্তার। তাঁরাও সেখান থেকে কিভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা যায় সে পথ খুঁজতে থাকেন। তাঁদের একত্রিত হতে সময় লাগে প্রায় ৩ মাস। জুলাই মাসের ৩ তারিখ বাংলা মায়ের ৪ বীর সন্তান এক সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাড়ি জমান ভারতের উদ্দেশ্যে। দেশ মাতৃকার টানে তাঁরা বহু কষ্টে রাতের অন্ধকারে বৃষ্টিতে ভিজে খরস্রোতা নদী পার হয়ে প্রথমে দিল্লী, পরে কোলকাতায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী রণক্ষেত্র থেকে কোলকাতায় এসে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান।  ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে ৭ নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। ‘৭১-এর ১২ থেকে ১৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর পশ্চিম দিক দিয়ে লে. কাইয়ুম, লে. আওয়ালসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর বারঘরিয়া-আকুন্দবাড়িয়া ফেরী ঘাট দিয়ে মহানন্দা নদী পার হয়ে পৌর এলাকার মোহনপুরে অবস্থান নেন। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ছিলেন অসীম সাহসী, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন সেনা অফিসার। বাঙালি নিধন আর মা বোনের সম্ভ্রম হানী তাঁকে যুদ্ধ জয়ে আরো দৃঢ় করে তুলেছিল। ১৪ ডিসেম্বর সূর্য ওঠার আগেই শুরু করলেন অভিযান। অস্ত্র হাতে তিনি মোহনপুর থেকে টিকরামপুর হয়ে মহানন্দা নদী তীর দিয়ে এগিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন ইউনিট কমান্ডার অধ্যাপক শাজাহান মিয়াসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। ১৪ ডিসেম্বর সকাল ৯ টার দিকে তিনি মহানন্দা সেতু সংলগ্ন রেহায়চরে শত্রæর বাঙ্কার লক্ষ্য করে এগিয়ে যান। এমন সময় শত্রæর একটি বুলেট বিদ্ধ হয়ে তিনি শাহদাৎ বরণ করেন। সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন বাংলা মায়ের বীর সন্তান ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে মুক্তি বাহিনীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডার মোঃ সিরাজুল ইসলাম জানান, শিবগঞ্জ, রহনপুর মুক্ত হওয়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর মুক্ত করার জন্য বারঘরিয়া, সুইজগেট, রাজারামপুরসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের বাঙ্কার ধবংস করার পর ১৪ ডিসেম্বর রাতভর শত্রুসেনারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১৫ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বিজয় উল্লাস করেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেদিনই মুক্তি সমাবেশ করা হয়। কিন্তু জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দি থাকায় উৎফুল্লভাবে বিজয় উল্লাস করতে পারে নি মুক্তিযোদ্ধারা। ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ মুক্ত হলে বিজয় উল্লাস করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *