Sharing is caring!

শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজ অধ্যক্ষের অনিয়ম-দূর্ণীতির

পাহাড় : চলছে তদন্ত : শেষে ব্যবস্থা

♦ স্টাফ রিপোর্টার 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি স্বনামধন্য ও অন্যতম বিদ্যাপিঠ শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজ। এই কলেজটি একজন আওলিয়া হযরত শাহনেয়ামতুল্লাহ’র নামে প্রতিষ্ঠিত। এই কলেজের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের অনিয়ম-দূর্ণীতি, স্বৈচ্ছাচারিতা, পারিবারিকতন্ত্র, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষক নির্যাতনসহ পাহাড় পরিমান অভিযোগ পাওয়া গেছে। দূর্ণীতিবাজ এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যেই কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অধ্যক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রথমে ১মাস এবং পরে আবারও ১ মাসের মেডিকেল ছুটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নানা সুত্রে জানা গেছে, এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে দ্বিগুন বা বোর্ড নির্ধারিত টাকার চেয়ে অনেক বেশী টাকা আদায় করা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক কলেজের ৪০ বছর পূর্তির নামে চাঁদা আদায়, কলেজ সরকারী করণের নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে নেয়া জোরপূর্বক ৬০ হাজার করে টাকা ফেরত না দেয়া, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায়, অধ্যক্ষের ছেলে হাসনাত আল মাহমুদ (ডন) এর শিক্ষক নিবন্ধন পর্যন্ত না থাকলেও কলেজের শিক্ষক হিসেবে ক্লাশ নেয়া, খাতা দেখা, খাতা দেখার অযুহাতে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা, কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে অধ্যক্ষের ছেলে হাসনাত আল মাহমুদ (ডন)’র স্বৈরাচারী আচরণ, শিক্ষক নিবন্ধন না থাকলেও অধ্যক্ষের নিজ ভাই একই কলেজের শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বাবু’র স্ত্রী সেলিনা খাতুনকে (বাংলা) কলেজের অনার্স বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ ও ক্লাশ করানোসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা, অধ্যক্ষের মেয়ে সারমিন সুরাইয়া তাকরিমা (রিপা), ঢাকায় একটি কলেজে নিয়োগ নিয়ে শিক্ষকতা করলেও তাকে এই কলেজে নিয়োগ দিয়ে রাখা, পারিবারিক তন্ত্রের কারণে স্থানীয় শিক্ষিত যোগ্যতাসম্পন্ন যুবকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, কলেজের সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দ ও অনিয়মের সহযোগিতাকারীদের দিয়ে কলেজের আর্থিকসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন করে কাজ করানো, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী বা অধ্যক্ষের অনিয়মে সম্মতি না দেয়া শিক্ষকদের নানা অযুহাতে হয়রানী করা, অনার্স কলেজ হলেও উপাধ্যক্ষের জন্য নিজ কক্ষ বা বসার স্থান না দেয়া, নিজ পছন্দের এবং তাঁর অনিয়ম ও অবৈধ কাজের প্রতি সমর্থন দেয়া গণ্যমান্য একই ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কলেজের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা (কমিটি গঠনের বিধিমত প্রক্রিয়া করে)। কলেজের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অধ্যক্ষের একক স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন, কলেজের পৃথক পৃথক এ্যাকাউন্টগুলোতে টাকা না থাকা (একটি এ্যাকাউন্টে সামান্য টাকা রয়েছে), কলেজের অনার্স বিভাগের লক্ষ লক্ষ টাকা অধ্যক্ষ নিজে এবং নিজের অন্যায়ের সহযোগী ও বুদ্ধিদাতাদের নিয়ে ভাগবাটোয়ারা ও সুবিধা ভোগ করা, অনার্স বিভাগের ৬টি বিভাগে যথেষ্ট পরিমান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ফি আদায় করে নিজেদের সুবিধা নিলেও অনার্স বিভাগের শিক্ষকদের সঠিকভাবে বেতন-ভাতাদী না দেয়া, প্রতিবাদ কারী শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে হয়রানীর হুমকি-ধামকিসহ নানা কৌশল করা, অধ্যক্ষের ছেলে হাসনাত আল মাহমুদ (ডন)কে অবৈধভাবে গত ২৪মে সরকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া এবং সেটা জানাজানি হওয়ায় অন্য শিক্ষককে অধ্যক্ষের ছেলের বদলে তালিকা পরিবর্তন করে ছেলের অবৈধ কাজকে ধামাচাপা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করা, গত ২৫মে ছুটিতে গিয়েও ২৬মে একক স্বাক্ষরে থাকা ব্যাংক এ্যাকাউন্ট থেকে ৩ লক্ষ টাকা উঠিয়ে নেয়া, এইচ.এস.সি, ডিগ্রী ও অনার্স বিভাগের টাকার সঠিকভাবে কোন হিসাব না দেয়া বা কোন অডিট না করা, কলেজের উন্নয়নের নামে টাকা লুটপাট করাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য জেলা প্রশাসক ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি (বর্তমানে সভাপতি পরিবর্তন) এ জেড এম নূরুল হক কলেজের অধ্যক্ষের অনিয়ম-দূর্ণীতির বিষয়ে তদন্ত করছেন। কলেজের সভাপতি পরিবর্তন হওয়ায় শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগি শিক্ষকরা একটু নড়ে চড়ে বসেছেন এবং আবারও প্রতিবাদকারী শিক্ষকদের উপর রক্তচক্ষু দেখাতে শুরু করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দূর্ণীতিবাজ অধ্যক্ষ ছুটি শেষে কলেজে ফিরে আসলে তাঁদের (প্রতিবাদকারীদের) বিরুদ্ধে কি ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করবে, এমন হুশিয়ারী এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কলেজের উপধ্যক্ষ মো. শরিফুল আলমকেও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি, কলেজে অস্থিতিশিল পরিবেশ সৃষ্টি করে ভয়ভীতি এবং হুমকী দিয়ে আতংকিত রাখছেন অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগিরা। সুষ্ঠ ও স্বচ্ছভাবে কলেজ পরিচালনার জন্য কলেজ পরিচালনা পর্ষদের দেয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক কলেজের আভ্যন্তরিন ২টি উপ-কমিটির সদস্যদের কাজে বাধাদান ও কমিটির সদস্যদের নিরুৎসাহিত করা। সব মিলিয়ে তাঁর এই দূর্ণীতির পাহাড়ের সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কলেজটিকে এই দূর্ণীতিবাজ অধ্যক্ষের হাত থেকে রক্ষা করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি এবং সুষ্ঠুভাবে কলেজ পরিচালনার জোর দাবী জানিয়েছেন শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ ও জেলার শিক্ষানুরাগী গণ্যমান্যজন। এদিকে, কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের তথ্য তুলে ধরে স্থানীয় দৈনিক ‘দৈনিক চাঁপাই দর্পণ’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদ ৪০ বছর পূর্তি বাতিল করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া চাঁদা ফেরত দেয়া শুরু করে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে এবং চাঁদা ফেরত প্রায় শেষের দিকে। এছাড়া কলেজের অন্যান্য দূর্ণীতি, অনিয়ম, শিক্ষক নির্যাতন, সরকারীকরণের নামে নেয়া টাকা, অবৈধভাবে ব্যাংক এ্যাকাউন্ট পরিচালনা ও টাকা উত্তোলন এবং বিনা হিসাবে টাকা খরচ, অবৈধভাবে পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ, ছেলের কলেজে চালানো দাম্ভিকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের তদন্ত চলছে। কলেজের অনার্স বিভাগের আর্থিকসহ নানা অনিয়মের বিষয় তুলে ধরে এবং প্রতিকার চেয়ে অধিকাংশ শিক্ষক স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্রও পাওয়া গেছে। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মো. শরিফুল আলম জানান, অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলামের অনিয়ম-দূর্ণীতির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ ও তাঁর কিছু অনুচর শিক্ষক রয়েছেন, (মো. আজমল হোসেন, বিলকিস আরা বানু (মহুয়া), মো. শাহিন কাওসার, মো. শাহজামাল, মো. আব্দুর রাজ্জাক, প্রশান্ত কুমার সাহা, মাহফুজুল হাসান (ডন)সহ অধ্যক্ষের অনুগত আরও কয়েকজন শিক্ষক) যাঁরা নানাভাবে কলেজের কাজে বাধা সৃষ্টি এবং অসহযোগিতা করছেন। ছুটিতে থাকলেও কলেজের বাইরে মার্কেটে বসে থেকে অদৃশ্য ইশারা-ইঙ্গিতে অধ্যক্ষ নিজে নানাভাবে ভয়ভীতি ও তাঁর দূর্ণীতির বিষয়তুলো চাপা দিয়ে রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। ইতোমধ্যেই গত ২৭ জুন শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদ অলংকৃত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি ইসলাম জেসী। এব্যাপারে জেলা প্রশাসক এ জেড এম নূরুল হক জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শাহনেয়ামতুল্লাহ কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জানার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও এর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু আর্থিক ও অন্যান্য অনিয়ম দূর্ণীতির বিষয়ে সত্যতাও মিলেছে। বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব কম সময়ের মধ্যেই তদন্ত কাজ শেষ হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কলেজ সভাপতি পরিবর্তন এবং তদন্ত কাজে প্রভাব পড়ার আশংকা বিষয়ে তিনি বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পরিবর্তন হতেই পারে, কিন্তু একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে জেলায় যে কোন অনিয়ম-দূর্ণীতির বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে জেলা প্রশাসকের। তিনি আরও বলেন, কলেজের ৪০ বর্ষপূর্তি বাতিল করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া টাকা ফেরত দেয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। কলেজের অধ্যক্ষ বর্তমানে প্রায় ২মাস মেডিকেল ছুটিতে রয়েছেন। ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি ফিরতে পারেন। এছাড়া অন্যান্য অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিষয়ে তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কলেজটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সুন্দর পরিবেশে যেন পরিচালনা হয়, সে জন্য, যা করনীয় তাই করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *