Sharing is caring!

মোহাঃ ইমরান আলী \ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীদের হাতে শহীদ হওয়া প্রায় ৩০জনের কঙ্কালসহ নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর জঙ্গল পরিস্কার করতে গিয়ে গণকবরটির সন্ধান পান শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের মৃত ইদ্রিশ বিশ্বাসের ছেলে দুরুল হোদা। এই গণকবরটি সংস্করণের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণের পরিবার ও এলাকাবাসী। স্থানীয় সূত্র ও সরজমিন পরিদর্শন করে জানা গেছে, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি মৌজায় ৪৪১, ৪৪২ ও ৪৪৩ নং দাগের জমিতে এই গণকবরেরর সন্ধান পাওয়া যায়। ধোবপুকুর বাজার তরুণ উন্নয়ন ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতায় এই গণকবরের সংবাদ পাওয়ার পরপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সরজমিনে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে দেখতে পাওয়া যায় বেশকিছু শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কঙ্কালের হাঁড়। জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ সেতাউর রহমান ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে হত্যাকান্ডের পর তাদের লাশ গাছে ঝুলিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মাটিতে পুঁতে রাখে দেশীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনীরা। এমন-ই পিতা শহীদ সেতাউর রহমান ও বড় ভাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে হত্যাকান্ডের দৃর্শ্যরে কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন মোবারকপুর ইউনিয়নের সাবেক  ইউপি সদস্য  ৬৫ বছরের বৃদ্ধ সাদিকুল আলম বিশ্বাস। অঝরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় আমি কানসাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৭১ সালের ২৩ নভেম্বর বুধবার আমার বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস গোপনে কলাবাড়িতে পাক বাহিনীর আস্তানায় হামলা করার জন্য দুটি গ্রেনেডসহ বাড়িতে আসে। দেশীয় রাজাকাররা টের পেয়ে পাকবাহিনীকে সংবাদ দিলে তারা সেদিনই বিকেল ৩টার দিকে আমার ভাইকে বাড়ি থেকে ধরে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই আবারো তারা আমার আব্বাকে বাড়ি থেকে ধরে ফেলে এবং আমাকে ধরার চেষ্টা করলে আমি পালিয়ে যায়। ২৭ নভেম্বর রবিবার আমি গোপনে দূর থেকে দেখার চেষ্টা করি। সে সময় দেখি তারা আমার আব্বা ও বড় ভাইকে বেঁধে কয়েকটি গুলি করে হত্যা করে। এরপর লাশ দুটিকে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পরে মাটিতে পুতে ফেলে। আমি সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে আসি এবং নাচোলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আশ্রয় নিই। তিনি আরো জানান, দেশ স্বাধীনের পর সেখানে গিয়ে দেখি দুটি গর্তে প্রায় ৫০/৬০জনের কঙ্কাল। তাছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো আনেকের মৃত দেহের কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেছি। কান্নাজড়িত কন্ঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ৪৭ বছরের মধ্যে কেবল মাত্র সাবেক সাংসদ মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার মইন উদ্দিন আহমেদ মুন্টু ডাক্তারের আমলে দুই ব্যান্ডিল টিন পেয়েছিলাম। তারপর আর কেউ কোনদিন খোঁজ নেয়নি। মোরারকপুর ইউনিয়নের কান্তিনগর গ্রামে তাঁর নিজ বাড়িতে এসব কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। পাকবাহিনীর হাতে নিহত শহীদরা এ গড়ে চিরশায়িত আছেন। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদদের রাষ্ট্রীয় মযার্দা ও জীবিত রাজাকারদের বিচার ও মৃত রাজাকারদের সম্পত্তি বাজেয়োপ্ত করা জন্য সরকারের নিকট আকুল আবেদন করছি। এদিকে মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি মৌজায় ৪৪১, ৪৪২ ও ৪৪৩ নং দাগের জমিতে গণকবরটি দেখতে যাওয়া মাত্রই জমির মালিক মৃত ইদ্রিশ বিশ্বাসের ছেলে দুরুল হোদ বললেন, যুদ্ধের সময় আমি ১২ বছরের ছেলে। পাকবাহিনী আমাকে দিয়ে তাদের সমস্ত কাজ করাতো। এ সময় অনেকের পোষা গরু-ছাগল-মুরগি লুট করে নিয়ে আসতো। আমাকে তাদের আস্তানায় থাকতে বাধ্য করতো। সে সময় আমি দেখেছি কানসাট, শ্যামপুর, মোবারকপুর, শাহাবাজপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে ধরে এনে বিভিন্নভাবে অমানষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে গর্তে পুঁতে ফেলতো। এখানে শতাধিক ব্যক্তি শায়িত আছেন। তিনি আরো জানান, তাদের আস্তানাটি ছিল আমার জমির উপর। স্বাধীনতার পর আমি সমস্ত লাশের মাথা, খুলি, দাঁত, হাত পায়ের হাঁড় বিভিন্ন স্থান থেকে কুড়িয়ে এক জায়গায় করে সংরক্ষণ করি। পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই সাদিকুল আলম বিশ্বাস আমার নিকট জমিটুকু ক্রয় করতে চাইল, আমি বিক্রী না করে আমি স্বেচ্ছায় দানপত্র দলিল করে দিয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আজ অবধি জায়গাটি সরকারীভাবে সংরক্ষণ হয়নি। আমার শেষ আশা রাজাকারদের বিচার ও জায়গাটি সংরক্ষিত দেখার। মোবারকপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ি গ্রামের মৃত ওয়াজেদ আলির ছেলে এহিয়া হোসেন(৬৫) বলেন, নিজ চোখে দেখেছি ও জেনেছি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা করায় কান্তিনগর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস ও তার পিতা সেতাউর রহমানসহ কয়লায় দিয়াড় গ্রামের ৭/৮জনসহ মোট ২০জন নিরিহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে তাদের আস্তানার পার্শ্বে পুঁতে ফেলে পাকবাহিনী দেশীয় রাজাকার গফুর, আহাদ, রউফ, মেনু জোলা, মনজুর, সেতাউর ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞা। তিনি  আরো জানান, স্থানটিতে এতদিন জঙ্গল ছিল। সাপের ভয়ে কেউ সেখানে যেতো না। এলাকার কয়েকজন যুবক জঙ্গল পরিস্কার করেছে। মোবারকপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসাহাক মিঞা বলেন, ১৯৭১ সালে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মোবারকপুর গ্রামে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞার নেতৃত্বে এলাকার ২০জন নিরহ মানুষকে ধরে বেধে নির্যাতন করার দৃশ্য দেখে আমি আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় এবং জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করি। যুদ্ধে শেষে বাড়ি ফিরে এসে জানতে পারি, দেশীয় রাজাকার গফুর, মনজুর, চান্দু, মেনু, আলফাজ আহাদ হুমায়ুন মাস্টার আলমগীর ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান কাদির মিঞাসহ ৫০/৬০ জন রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী, কানসাট, শ্যামপুর, মোবারকপুর, শাহাবাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকার রিপন আলি, আব্দুস ক্দ্দুুস, আবু আলি ও বিসু আলি এ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ সেতাউর রহমান, বজলার রহমান, লাল মোহাম্মদ, মোজাম্মেল হক, মহি উদ্দিনসহ শতাধিক নিরহ মানুষকে ধরে এনে কলাবাড়ি আস্তানায় এনে গুলি করে হত্যা করে লাশগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে কঙ্কাল গুলিকে গর্তে পুঁতে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, তারা এলাকার শত শত মা-বোনদের উপর নির্যাতনও চালিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে এ বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ, রাজাকারদের বিচার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি। শিবগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বজলার রহমান সোনু  জানান, শুধু মোবারকপুরেই নয় উপজেলার সমস্ত বধ্যভুমিকে সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের নিকট আমাদের দাবী অব্যহত থাকবে। তবে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার সেরাজুল হক কোন মন্তব্য না করে বলেন, এগুলো আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *