Sharing is caring!

সংখ্যালঘুদের জীবনে আরেকটি

২০০১ ফিরে না আসুক

সংঘাত সহিংসতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত সহিংসতা যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই সংঘাত সহিংসতার মধ্যে যে বিষয়টি ছাপিয়ে যায় তা হলো সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা। আমাদের সংবিধানে ‘সংখ্যালঘু’ বলে কোনো শব্দ নেই, তবে শব্দটি বহুল প্রচলিত ও ব্যবহৃত। শব্দটি একান্তই আমাদের নিজস্ব ঢঙে এবং উপস্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
তবে বাংলাদেশে সাধারণত সংখ্যালঘু বলতে হিন্দু সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়ে থাকে। তাছাড়া, বাংলাদেশে ধর্মীয় বাদে জাতিগত ও ভাষাগত উপায়েও সংখ্যালঘু নির্ণয় করা যায়। নির্বাচন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে সারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলতে হিন্দুদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়ে থাকে। একটি পক্ষই রয়েছে যারা সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে নির্বাচনোত্তর ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে চায়।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সাল। সবে নির্বাচন হয়েছে । বিএনপি জামায়াত জোট সরকার জয়ী হয়েছে। চাপ পড়ছে হিন্দু পাড়াগুলোর ওপরে। সংখ্যালঘুরা সব নৌকায় ছাপ মেরেছে। মনে আছে পূর্ণিমার কথা? সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার দেলুয়া গ্রামের অনীল কুমার শীলের মেয়ে পূর্ণিমা শীল, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। নৌকায় ভোট দেয়ার অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা রাতের আঁধারে জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে ১২ থেকে ১৩ বছরের পূর্ণিমাকে ধর্ষণ করে পালাক্রমে। ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল পালাক্রমে মায়ের সামনেই ধর্ষণ করছিল পূর্ণিমাকে। এত মানুষ দেখে পূর্নিমার মা বলছিলো ‘বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো, নয়তো আমার মেয়েটি মরে যাবে’। অসহায় বাবা দেখলো মেয়ের ধর্ষণ, মা আকুতি করলো। ধর্ষিত পূর্নিমা অবশ্য সে রাতে মরেনি। মরার মতো বেঁচে থাকতে হয়েছে ১১ টি বছর। বিচার পেতে অপেক্ষা করতে ১১ টি বছর। অবশেষে আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরে বিচার মিলেছে সেই পূর্ণিমা শীলের পরিবারের।

ছবি রানীর কথা মনে আছে? তিনি একজন সামান্য আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। বাড়ি বাগেরহাটের রামপালে। ২০০২ সালের ২১ শে অগাস্ট তৎকালীন জোট বাহিনীর ক্যাডার দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হন তিনি। তৎকালীন ক্ষমতাসীন ক্যাডাররা ছবি রানীকে বাস স্ট্যান্ড থেকে কাপড় খুলে ফেলে। এরপর তাকে বিএনপি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর একের পর এক ক্যাডার দ্বারা তিনি ধর্ষণের শিকার হতে থাকেন। ধর্ষকরা ধর্ষণ করে ছবি রানীর গোপন অঙ্গে মরিচের গুড়া, বালি আর কাঁচের গুড়া ঢুকিয়ে দেয়। ছবি রানী যখন ধর্ষিত হচ্ছিল তখন পাশের দোকানে পুলিশ বিড়ি ফুঁকছিল। তার চিৎকারে সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, পুলিশও সেদিন ফিরেও তাকায়নি। ছবি রানীকে বাঁচাতে সেদিন কেউ আসেনি। ধর্ষকরা ধর্ষণ করে চলে যাবার পরে ছবি কোনো মতে উঠে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। পাশের চায়ের দোকানদার খিতিশ সাহা তাকে সেই মুহূর্তে খুলনা মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি করান। খবর পেয়ে তৎকালীন এমপি খুলনা সিটির মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক সেখানে ছুটে যান। ছবির অবস্থা আশংকাজনক জেনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে খুলনায় ছুটে আসেন। তিনি ছবির উচ্চ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনের বিদেশে নেবার কথা বলেন এবং দলের পক্ষ থেকে তিনি চিকিৎসা খরচ বহন করতে নির্দেশ দেন। ছবিকে খুলনা থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসায় তিনি খানিকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলে অবর্ণনীয় নির্যাতন। বাড়িঘর লুটপাট, জোরপূর্বক চাঁদাবাজি, এমনকি নারী ধর্ষণের অজস্র ঘটনা ঘটে এ সময়। এসবের অধিকাংশই পুলিশের নথিভুক্ত হয়নি। অধিকাংশ ভুক্তভোগীরা ভয়ে কোনো অভিযোগ পর্যন্ত করেনি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে লোকলজ্জা ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে পরিবারের মহিলারা ধর্ষিত হওয়ার পরও আইনের আশ্রয় নেয়নি। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানলেও বা অনুমান করলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই তা স্বীকার করেনি। সে সময়ে তিক্ত স্মৃতি স্মরণ করেন রাজিহারের শেফালী সরকার। তিনি তখন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। গ্রামের মানুষের কাছে আরেকটি পরিচয় ছিল- ‘ঘরের ডাক্তার’। টুকটাক চিকিৎসা দিতেন গরিব মানুষদের। নির্বাচনে কাজ করেন আওয়ামী লীগের পক্ষে। এটাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা। তাকে চায়নিজ কুড়াল দিয়ে কোপানো হয়। ১৭ বছর পরও তার শরীরে এ আঘাতের ক্ষত রয়ে গেছে। তিনি আগৈলঝাড়া থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন। সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন নির্যাতিতা নারী। থানার ওসি বলেন, ‘সব মিথ্যা-বানোয়াট।’ নির্বাচনের পরেও তিনি হামলার শিকার হন। প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন রামশীল এলাকায়।

উত্তর চরফ্যাশন গ্রামের বলরাম দাসের স্ত্রী কণিকা রানী দাসের ব্যাপারে জানা যায়, তাদের বাড়িতে ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর রাতে বিএনপি জামায়াতের সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করে মালামাল লুট করে এবং তার সম্ভ্রমহানি ঘটায়। এছাড়া স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেও শারীরিক নির্যাতন চালায়। এ ঘটনায় তারা পুলিশকে কিছু জানানোর সাহস পায়নি। অমর চন্দ্র দাসের স্ত্রী কল্যাণী দাস সম্পর্কে জানা যায়, গভীর রাতে সন্ত্রাসীরা তাদের বাড়িতে এসে ধান-চাল, জামাকাপড়সহ বাড়ির সকল মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। এ সময় তারা তার মেয়ের খোঁজ করে এবং মেয়েকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। কিন্তু মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং সেখানে নেই, এ কথা শুনে বিএনপি জামায়াতের সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামীর সামনে কল্যাণীকে ধর্ষণ করে। স্বামী বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর করে বেঁধে রেখে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনার পরও ভয়ে ও লোকলজ্জার কারণে তারা থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। আসামিদের নাম বলতেও অস্বীকৃতি জানায়। এছাড়াও প্রকৃতি রানী দাস, স্বামী লিটন দাস, রীতা রানী দাস, স্বামী সুব্রত দাস, শোভা রানী দাস, স্বামী নিরঞ্জন দাস, শেফালী রানী দাস, স্বামী সন্তোষ কুমার দাস, সর্বসাং দশনাথ, আলীগাঁও, উত্তর চরফ্যাশন, কর্তারহাটে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নির্যাতনের কারণে ক্ষোভে, ভয়ে, লজ্জায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে শতশত হিন্দু পরিবার আশ্রয় নেয় ভারতে।

একই বছর বাগেরহাটের যাত্রাপুরের ঠাকুর বাড়িতে এক রাতে ২৩ জন গৃহবধূকে বিএনপির ক্যাডাররা ধর্ষণ করে এবং সেখানে দুটো হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এটা কোনো পরিসংখ্যান নয়। এরূপ হাজার হাজার হিন্দু সম্প্রদায় জোট সরকার দ্বারা নির্যাতিত হন তৎকালীন সময়ে। সারা বাংলাদেশে তখন হিন্দুদের জন্য আতংকের দেশ হিসেবে পরিণত হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতন দেখে প্রতিবেশী দেশ ভারত চাপ দিতে থাকে খালেদা-নিজামী সরকারকে। এসময় সারাদেশে শতশত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ছয় শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য প্রাণ হারায়, আহত হয় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ, ১২ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করে।

সংঘবদ্ধভাবে হামলা, নির্যাতন, লুটতরাজে নিঃস্ব হয় লক্ষাধিক হিন্দু পরিবার। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে গঠিত তদন্ত কমিশন পাঁচ হাজার ৫৭১টি অভিযোগ পায়। ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া অভিযোগের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬২৫টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ৩৫৫টি এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, গুরুতর আঘাত, চিরতরে পঙ্গু করা, সম্পত্তি দখল ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ তিন হাজার ২৭০টি। বিভিন্ন কারণে এক হাজার ৯৪৬টি অভিযোগ বাতিল করারও ঘটনা ঘটে। তদন্ত করা তিন হাজার ৬২৫টি ঘটনায় ১৮ হাজারেরও বেশি লোক জড়িত বলে চিহ্নিত হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় যেসব ব্যক্তির ওপর হামলা, লুটপাট, গণধর্ষণ করা হয়েছিল, তারা থানায় বা আদালতে অভিযোগ দায়ের পর্যন্ত করতে পারেননি। কেউ অভিযোগ করতে পারলেও রাজনৈতিক কারণে তদন্ত হয়নি। রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন-সন্ত্রাস চালিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না সংশ্লিষ্টরা। জোট সরকারের আমলে হামলা-সন্ত্রাস লুটতরাজসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে পাঁচ হাজার ৮৯০টি মামলা প্রত্যাহারও করা হয়। ফলে এসব মামলার ১২ হাজার অপরাধী শাস্তি ছাড়াই বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে থাকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০১ সাল ও এর কাছাকাছি সময়ে দেশের ২৮টি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন হামলা ও নির্যাতনের শিকার হতেন। এসময় দেশের ৪৩ জেলায় ব্যাপক হারে নির্যাতন ঘটে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আবারো শঙ্কিত ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা। বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসন আজও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায় তাদের। জাতীয় প্রেসক্লাবে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাস গুপ্ত সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে চিরতরে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি যেন আবারো মাথাচাড়া দিতে না পারে সে লক্ষ্যেই হোক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পথচলা।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *