Sharing is caring!


স্টাফ রিপোর্টার \ বর্তমান সরকার কৃষক বান্ধব সরকার। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌছে দিতে সরকার পদ্ধপরিকর। এরই অংশ হিসেবে সরাসরি তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান/চাল ও গম সংগ্রহ প্রকল্প হাতে নেয় বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি বা নেতৃবৃন্দের ¯ে^চ্ছাচারীতায় সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ বিঘিœত হচ্ছে। ব্যহত হচ্ছে সরকারের কাক্সিখত লক্ষ্য। বঞ্চিত হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকরা। সরকার দেশকে ¯^নির্ভর করতে দারিদ্র বিমোচন ও সাধারণ কৃষকদের সার্বিক সুবিধা দিয়ে কৃষিখাতকে সম্প্রসারিত করছে। সাধারণ কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে নিজের পরিবারকে ¯^চ্ছল করতে কঠোর পরিশ্রম করছেন। এছাড়া সাধারণ কৃষকদের কথা চিন্তা করে প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় গম চাষিদের কাছ থেকে খোলা বাজারের তুলনায় বেশি দাম দিয়ে সরকার সরাসরি তৃণমূল কৃষকদের কাছ থেকে গম কিনছেন। খোলা বাজারে গমের দাম ২৪/২৫ টাকা। সরকারীভাবে গম ক্রয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ টাকা। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী জেলায় গমের দাম অনেক কম থাকায় জেলার কৃষকদের কাছ থেকে না নিয়ে বাইরের জেলা থেকে দালাল বা ফড়িয়াদের মাধ্যমে গম সংগ্রহ করে গুদামজাত করা হচ্ছে। এতে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন দালাল এবং ক্ষমতাসীনরা। বর্তমান সরকার কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য দেয়ার লক্ষে সরসারি কৃষকদের কাছ থেকে ধান/চাল ও গম সংগ্রহ কার্যক্রম হাতে নেয়ার সুত্র ধরে সারাদেশের মত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সকল উপজেলায় গম সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। কিন্তু সরকারী নীতিমালা উপেক্ষা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সাধারণ গম চাষিদের কাছ থেকে গম সংগ্রহ না করে ব্যাপারী ও দালালের মাধ্যমে গম সংগ্রহ করছে শিবগঞ্জ উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জানা গেছে, সারাদেশের ন্যায় শিবগঞ্জ উপজেলাতেও গত ২৭ এপ্রিল থেকে গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। আর এই গম সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নীতিমালা মোতাবেক উপজেলার কার্ডধারী কৃষক ও সাধারণ গম চাষীদের কাছ থেকে তালিকার মাধ্যমে গম সংগ্রহ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সাধারণ গম চাষিদের তালিকা না করে ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে ও নিজের ইচ্ছে মত তালিকা তৈরি করে ব্যাপারী ও দালালের মাধ্যমের গম সংগ্রহ করা হচ্ছে। এদিকে খাদ্য সংরক্ষণ গুদাম এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সাধারণ চাষীদের কাছ থেকে গম সংগ্রহ না করে ব্যাপারী ও দালালের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাইরে থেকে গম নিয়ে এসে খাদ্য গুদাম ভর্তি করা হচ্ছে। এতে সরকারের ধার্যকৃত দামের টাকা সাধারণ চাষিদের না দিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারী, দালাল ও ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাদের পকেটে। জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায়শই ট্রাক বা ট্রাক্টরযোগে নি¤œমানের এবং কম দামে গম নিয়ে এসে গুদামজাত করা হচ্ছে দালালদের মাধ্যমে। বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় কৃষকরা। স্থানীয় অনেক কার্ডধারী ও সাধারণ মানুষ গম সংগ্রহের বিষয় জানতেই পারেনি। উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রকৃত কার্ডধারী ও সাধারণ কৃষকদের তালিকা তৈরী করার নিয়ম থাকলেও তালিকা তৈরী হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের নিজেদের পছন্দমত লোকদের দিয়ে। নীতিমালা মোতাবেক স্থানীয় কার্ডধারী বা সাধারণ কৃষদের কাছ থেকেই গম সংগ্রহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু গম সংগ্রহ করা হচ্ছে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ¯ে^চ্ছাচারীতার মাধ্যমে। এভাবে গম সংগ্রহ হওয়ায় যেমন স্থানীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তেমনই সরকারের আসল উদ্দেশ্য ব্যহত হচ্ছে। এদিকে, শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর, বিনোদপুর, শ্যামপুর, চককীর্ত্তি, মনাকষা, ছত্রাজিতপুর ও দূর্লভপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের সাধারণ চাষিদের কৃষি কার্ড থাকলেও গম সংগ্রহের নামের তালিকা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে গম সংগ্রহের বিষয় সরজমিন পর্যবেক্ষনে গিয়ে প্রতিবেদকের চোখে পড়ে বাইরের জেলা থেকে গম নিয়ে আসা বেশ কিছু ট্রাক। এব্যাপারে গম বহনকারি ট্রাক চালক আলমঙ্গীর হোসেন জানান, আমি ঠাকুরগাঁও থেকে গম নিয়ে এসেছি। আমরা এক সাথে ৫ ট্রাক গম শুক্রবার দুপুরে শিবগঞ্জ উপজেলার খাদ্য গুদামে এসে পৌঁছেছি। এখানে এই গমগুলো আনলোড করা হবে। গমগুলো কে নিয়ে এসেছে তা জানতে ট্রাক চালক আলমঙ্গীর হোসেন বলেন, জাইদুল নামে এক ব্যবসায়ী আমাদের নিয়ে আসে। তার মাধ্যমেই ঠাকুরগাঁও থেকে গমগুলো নিয়ে আসি। এব্যাপারে, মোবারকপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তৌহিদুর রহমান (তৌহিদ মিঞা) জানান, আমার ইউপিতে প্রায় ২ হাজার ৬’শ কৃষকের কার্ড রয়েছে। এবছর অনেকেই গম চাষ করেছে। চাষিদের কাছ থেকে যে  উপজেলাতে সরকারিভাবে গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে তা আমার জানা নাই। আমার ইউনিয়নের কোন কৃষকদের কাছ থেকে গম সংগ্রহ করা হয়নি। শ্যামপুর ইউপি চেয়ারম্যান খাইরুল ইসলাম বলেন, সরকারীভাবে গম সংগ্রহের বিষয়টি আমার জানা নাই। তবে, জেনে বলতে পারবো। অন্যদিকে, চককীর্ত্তি ইউপি চেয়ারম্যান মোফাখখারুল ইসলাম (খাইরুল ইসলাম) জানান, আমার ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার ৩’শ কৃষকের কৃষি কার্ড আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬’শ জন কৃষক এবছর গম উৎপাদন করেছে। প্রতিটা কৃষক ৫ বিঘা করে গম চাষ করেছে। কিন্তু সরকারীভাবে যে, গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে তা আমার জানা নাই। আমাকে উপজেলা থেকেও কোন চিঠি দেয়নি। আর আমার ইউনিয়নের কোন কৃষক উপজেলাতে সরকারিভাবে গম দিচ্ছেনা। তাদের কোন তালিকাও করা হয়নি। কিভাবে এই গম সংগ্রহ করা হচ্ছে সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো না। অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার কয়েকজন চেয়ারম্যান জানান, সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে গম সংগ্রহ কার্যক্রম কখন শুরু হয়েছে তা বলতে পারছি না। উপজেলা থেকে চিঠি বা অন্য কোনভাবেই জানানো আমাদের জানানো হয়নি। আমরা জনপ্রতিনিধিরা না জানলে, সাধারণ কৃষক কিভাবে জানবে? এছাড়া উপজেরার প্রায় ইউনিয়নে একই চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। গম সংগ্রহের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা অমল চন্দ্র সরকার জানান, গত ২৭ এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। তিনি আরো বলেন, এবছর সরকারিভাবে গম সংগ্রহ করা হবে ২ হাজার ৬’শ ৮৫ মেট্রিক টন। কৃষকদের তালিকা দিবে কৃষি অফিসার। আর উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা দিবে সুপারিশ। এতে খাদ্য অধিদপ্তরের কোন হাত নাই। তিনি আরো বলেন, আমি তো কৃষক চিনি না, কৃষক চিনে কৃষি অফিসারগণ। তারা কৃষকের তালিকা দিবে আমাদের। তাদের তালিকা ও প্রত্যায়ন মিল আছে কি-না তা মিল করে আমরা সেটা দেখে কৃষক চিনবো এবং তাদের সার্টিফিকেট দিবো। তাদের একাউন্টের টাকা জমা হবে এবং চেকের মাধ্যমে কৃষকরা গমের টাকা তুলবে। আমরা তাদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে গম সংগ্রহ করছি। খাদ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরো বিস্তারিত জানতে এই প্রতিবেদককে তার অফিসে যোগাযোগের জন্য বলেন। এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ এসএম আমিনুজ্জামান জানান, উপজেলাতে সরকারি গম সংগ্রহের জন্য আমার কাছ থেকে কৃষকদের কোন তালিকা নেয়া হয়নি। আমার মাধ্যমে গম সংগ্রহের তালিকা হবার থাকলেও তা করা হয়নি। আমার মাধ্যমে কোন কৃষক বা গম চাষিদের তালিকা খাদ্য অধিদপ্তরে যায়নি। এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকারীভাবে আমার কাছে কেউ কোন অভিযোগ করেনি। এই প্রথম কোন সাংবাদিক আমার কাছে গম সংগ্রহে অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করলো। আমার জানামতে গম সংগ্রহে কোন অনিয়ম হয়নি। নীতিমালা মোতাবেক গম সংগ্রহ করা হচ্ছে। গম সংগ্রহ কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে গম সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ হবে। অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে না করে নির্দিষ্ট করে বাইরের জেলা বলতে কোন কোন জেলা থেকে গম সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বা অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান সরকারী নিয়মনীতি মোতাবেকই গম সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। তালিকার মাধ্যমেই স্থানীয় প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই গম সংগ্রহ করা হচ্ছে। শুক্রবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে ৫ ট্রাক গম সরকারী গুদামে প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন। তবে উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা অমল চন্দ্র সরকার আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত গম সংগ্রহ করা হবে বলে জানান।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *