Sharing is caring!

৭১ বছরেও চিরসবুজ ‘কল-রেডি’

কত ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। আত্মদানের পাশাপাশি আরও কত ত্যাগ কতভাবে স্বাধিকার আন্দোলনকে বেগবান করেছে, সফলতার শিখরে নিয়ে গেছে তা নিরূপণ করা দুষ্কর। প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম সফল করতে নানামুখী প্রচেষ্টা দরকার। বাঙলার স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপের সাথে তেমনি কিছু নাম ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরবে-নিভৃতে। অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি। ভাষা আন্দোলনের পরেই বাংলাদেশে পাকিস্তানের নিপীড়নের ইতিহাস ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে এবং সেই সাথে বাড়তে থেকে মিছিল-সমাবেশ। মিছিল সমাবেশ হলেই সেখানে প্রয়োজন হত মাইকের। আর ’৫২ পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে “কল-রেডি” মাইক সার্ভিস জড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হিসেবে। কল-রেডি সার্ভিস ইতিহাসের এক অনবদ্য অংশ। ১৯৭১ এর সেই অগ্নিঝরা উত্তাল সময়ে কল-রেডি মাইক সার্ভিস ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হয়েও শুধুমাত্র দেশের স্বার্থে সেবা দিয়ে গেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭১ এর ও ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের সমাবেশেও যোগ দিয়েছে কল-রেডি। কল-রেডির মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালের জাতীয় নেতৃবৃন্দ। স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও কল-রেডি’র মাইক সার্ভিস সমানভাবে সেবা দিয়া যাচ্ছে।

বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের সহোদর দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাইকের ব্যবসা শুরু করলেন। প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল আই এম অলওয়েজ রেডি, অন কল এট ইয়োর সার্ভিস বা আরজা (এআরজেএ) অথবা ‘আরজু’ ইলেকট্রনিক্স। বছর খানেক পরই নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কল-রেডি’। মূলত লাইটিং, সাজসজ্জা ভাড়া দিত আরজু ইলেক্ট্রনিক্স। বিয়ে-শাদিতে লাইটের সঙ্গে গ্রামোফোনও ভাড়া নিত লোকজন। দোকানটি পরিচিত হয়ে ওঠে অল্প দিনেই। সেই সাথে চাহিদাও বাড়তে থাকে, চাহিদা অনুযায়ী যোগান দিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে কয়েকটি মাইক নিয়ে আসেন। কিন্তু তা দিয়েও চাহিদা পূরণ হচ্ছিল না।। মাইকের কারিগরি জানা থাকায় হরিপদ ঘোষ নিজেই যন্ত্রপাতি কিনে কয়েকটি হ্যান্ড মাইক তৈরি করেন। ১৯৪৮ সালে দেশ ভাগের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ভাষণের মাইক্রোফোন হলো কল-রেডি।  হাটে-মাঠে-ঘাটে সব জায়গায় তখন স্বাধিকারের চেতনায় ফুঁসছে মানুষ। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকে সারা দেশের মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। দফায় দফায় মিটিং করেও হচ্ছে না সুরাহা। এরই মধ্যে চলে এলো ১৯৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চ মাস। সমাবেশ যোগদানকারীরা শুনবেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা। দেশবাসী বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে আভহে, অধীর আগ্রহে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা জানতে। নেতার ভাষণ সুন্দর-সাবলীলভাবে সবাই যাতে শুনতে পারেন তার জন্য প্রয়োজন হয়ে পরে সুন্দর একটি সাউন্ড সিস্টেম বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কল-রেডির মালিক হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষকে ধানমণ্ডির বাসায় ডেকে পাঠালেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে [তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান] মাইক লাগাতে। জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই তাদেরকে নিষেধ করলেন। পাশাপাশি পাকিস্তানপন্থীদের হুমকিও ছিল যাতে জনসভা সফল না হয়। কিন্তু হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষের রক্তেও তখন শোষকদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মাইক সরবরাহের কাজে নেমে পরে কল-রেডি। তখন রেসকোর্সে মাইক লাগানো সোজা ছিল না-শাসকগোষ্ঠীর চোখ ছিল সদা সতর্ক। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মাইক লাগাতে লাগলেন দুই ভাই। মাইক লাগিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন তারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু বাড়তি মাইক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মজুদ রাখা হয় যেন সমাবেশের দিন তাৎক্ষণিকভাবে লাগানো যায়। তিন দিন ধরে ৩০ জন কর্মী নিয়ে বাঁশ, খুঁটি গাঁথার কাজ করেন ঘোষেরা।

তারপর সেই দিনটি আসে-৭ই মার্চ। কবি গিয়ে দাঁড়ান জনতার মঞ্চে। কল-রেডি’তে উচ্চারিত হলো ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর শ্বাস-প্রশ্বাসে দুলছিল কলরেডির মাইক্রোফোন, কাঁপছিল মাইকগুলো।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণকালে যেন কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি না হয়, সে জন্য নিজে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিয়েছিলেন হরিপদ ঘোষ। অতিরিক্ত তিনটি মাইক্রোফোন সঙ্গে রেখেছিলেন দয়াল ঘোষ।

বর্তমানে হরিপদ ঘোষের চার ছেলে ‘কল-রেডি’ কোম্পানির দেখভাল করছেন। ত্রিনাথ ঘোষ সাগর আছেন পরিচালক হিসেবে। সাগরের কাকা কানাই ঘোষ মারা গেছেন কয়েক বছর। ১২ বছর আগে বাবা হরিপদ ঘোষ গত হয়েছেন। বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসাটি সাগরের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়াও ব্যবসার দেখভাল করছেন বিশ্বনাথ ঘোষ। এখন কেমন ব্যবসা চলছে জানতে চাইলে তিনি অকপটে জানালেন খুবই ভালো চলছে। সব সময়েই ‘রেডি আছে কল-রেডি’।

আপনার মতামত লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *