মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৭
মানবিকতায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা

৭৫ বছরের রোকেয়া বেগমের ঘরে দেয়া হলো পানির সংযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিনিধি ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন
৭৫ বছরের রোকেয়া বেগমের ঘরে দেয়া হলো পানির সংযোগ

একদিকে ডেঙ্গু নিধনের অভিযান, অন্যদিকে মানুষের নীরব দুর্ভোগের চিত্র। মশার প্রজননস্থল খুঁজতে গিয়ে এবার সামনে এলো এমন এক মানবিক সংকট, যা নাড়া দিয়েছে সংশ্লিষ্টদের বিবেককে। নিজের বাড়িতে টিউবওয়েল থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে পানি তুলতে পারছিলেন না ৭৫ বছর বয়সী বিধবা রোকেয়া বেগম। বাধ্য হয়ে কখনো বৃষ্টির পানি জমিয়ে, কখনো প্রতিবেশীদের কাছে পানি চেয়ে চলছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবন। অবশেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষের হস্তক্ষেপে তাঁর বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে সরবরাহ লাইনের নতুন পানির সংযোগ। রোববার (১৮ অক্টোবর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার উপর রাজারামপুর এলাকার কুমারপাড়ায় রোকেয়া বেগমের বাড়িতে এ পানির সংযোগ দেওয়া হয়। পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে নেওয়া এ উদ্যোগে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তির পথ পেলেন অসহায় এই বৃদ্ধা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংসের লক্ষ্যে কাজ করছিল পৌরসভার টিম-৪। অভিযানের অংশ হিসেবে উপর রাজারামপুরের কুমারপাড়া এলাকায় গিয়ে সদস্যদের নজরে আসে রোকেয়া বেগমের বাড়িতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখার দৃশ্য। সংরক্ষিত পানিতে দেখা যায় পোকামাকড় ও মশার উপস্থিতি। সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিতে পানি অপসারণ এবং জমে থাকা পানি ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেওয়ার কথা। কিন্তু বিষয়টির গভীরে গিয়ে টিমের সদস্যরা জানতে পারেন, এর পেছনে রয়েছে এক বৃদ্ধার অসহায়ত্ব ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার গল্প। রোকেয়া বেগমের বাড়িতে টিউবওয়েল থাকলেও নিজের পক্ষে তা চেপে পানি তোলা সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। বর্ষা মৌসুমের বাইরে খাবার, গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাঁকে। একজন প্রবীণ মানুষের এমন দুর্ভোগের বিষয়টি টিম-৪-এর সদস্যদের কাছে স্পষ্ট হওয়ার পর তাঁরা বিষয়টি পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষকে অবহিত করেন। রোকেয়া বেগমের দুর্ভোগের কথা জানতে পেরে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন পৌর প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ। তাঁর উদ্যোগে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে বৃদ্ধার বাড়িতে সরবরাহ লাইনের নতুন পানির সংযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার তাঁর বাড়িতে পানির সংযোগ স্থাপন করা হয়। যে পানির জন্য এত দিন তাঁকে কখনো বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে, কখনো প্রতিবেশীদের দ্বারে যেতে হয়েছে, সেই পানি এখন তাঁর বাড়িতেই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। স্থানীয় পর্যায়ে এ উদ্যোগ শুধু একটি পানির সংযোগ স্থাপনের ঘটনা নয়-বরং জনসেবার সঙ্গে মানবিক দায়িত্ববোধ যুক্ত হলে সাধারণ মানুষের জীবনে কীভাবে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব, তারও একটি দৃষ্টান্ত। ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি। তবে রোকেয়া বেগমের ঘটনা দেখিয়েছে, কোথাও জমে থাকা পানি দেখলেই শুধু অভিযান পরিচালনা করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না, এর পেছনে কোনো অসহায়ত্ব, অব্যবস্থাপনা কিংবা মৌলিক সেবার অভাব রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শারীরিকভাবে অক্ষম একজন প্রবীণ নারী কেন নিজের বাড়িতে থাকা টিউবওয়েল ব্যবহার করতে পারছেন না, কেন তাঁকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হচ্ছে—এসব প্রশ্নও জনসেবার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। এধরনের পরিস্থিতিতে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মানুষের বাস্তব প্রয়োজন চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। রোকেয়া বেগমের ক্ষেত্রে পানির সংযোগের ব্যবস্থা সেই মানবিক সমাধানের পথই খুলে দিয়েছে। নগর পরিষ্কার রাখা, মশা নিধন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কিংবা নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, পৌরসভার প্রতিটি কাজের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। বিশেষ করে প্রবীণ, বিধবা, অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় প্রশাসনের মানবিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ সেই দায়িত্ব পালনের একটি ইতিবাচক উদাহরণ।


একই সঙ্গে ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, নাগরিক সেবার আওতায় থাকা কোনো মানুষ যেন কেবল শারীরিক অক্ষমতা বা অসহায়ত্বের কারণে মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন। ডেঙ্গু নিধন অভিযানে গিয়ে একটি পরিবারের বাস্তব সংকট চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া—এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও পৌরসভার অন্যান্য কার্যক্রমে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে। রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় দৈনিক চাঁপাই দর্পণের নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রতিনিধি মোঃ সেরাজুল ইসলাম ও মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। মানুষের দুর্ভোগ চিহ্নিত করে তার সমাধানে এগিয়ে আসাই জনসেবার প্রকৃত সার্থকতা। রোকেয়া বেগমের ঘরে পৌঁছে যাওয়া পানির সংযোগ তাই শুধু একটি সুবিধা নয়—এটি একজন অসহায় প্রবীণ মানুষের স্বস্তি ফিরে পাওয়ার গল্প। পানির নতুন সংযোগ পেয়ে রোকেয়া বেগম পৌর কর্তৃপক্ষ কে কৃতজ্ঞতা জানান। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক (উপ সচিব) উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর জনসচেতনতা ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে রোকেয়া বেগমের বিষয়টি ‘দৈনিক চাঁপাই দর্পণ’র নিজস্ব প্রতিনিধি মোঃ ইসাহাক আলী ও পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিধ মোঃ ইমরান হোসেন আমাকে জানালে আমি ৭৫ বছর বয়সি রোকেয়া বেগমের বিষয়টি খুব কষ্ট দেয়। আমি পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পানির নতুন সংযোগ করে দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।