চাঁপাইনবাবগঞ্জে পালিত সন্তানের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ জালিয়াতির অভিযোগ ॥ ক্ষুদ্ধ ভুক্তভোগীরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমনুরা ঝিলিম ইউনিয়নে পালিত সন্তান কর্তৃক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ওয়ারিশান সনদ জালিয়াতি করে প্রায় ৬০ বিঘারও বেশি পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জন্মদাতা পিতাকে গোপন করে পালিত পিতাকে নিজের বাবা সাজিয়ে এই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা এবং জমি ক্রেতাদের দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি করার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার প্রায় ৩৫-৩৬টি পরিবার। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝিলিম ইউনিয়নের তোফেল আলী নামের এক ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর পালিত সন্তান মীর ফিরোজ আলীর বিরুদ্ধে উঠে আসে এই ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, ফিরোজের প্রকৃত পিতা আসিরুদ্দিন হলেও তিনি তথ্য গোপন করে পালিত পিতা তোফেল আলীকে এনআইডি ও ইউনিয়ন পরিষদের সনদে নিজের পিতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। ভুক্তভোগী ও তোফেল আলীর উত্তরসূরিদের ভাষ্য, তোফেল আলী নিঃসন্তান হওয়ায় তার চার বোনের ওয়ারিশরাই নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী সম্পত্তির অংশীদার। বর্তমানে চার বোনের পরিবারের প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ জন সদস্য এই সম্পত্তির প্রাপ্য অংশীদার। কিন্তু তাদের কাউকে সম্পত্তির অংশ না দিয়ে মীর ফিরোজ আলী একাই প্রায় ৬০ থেকে ৬২ বিঘা জমি অবৈধভাবে ভোগদখল করে আসছেন। শুধু পৈতৃক সম্পত্তি দখলই নয়, সাধারণ মানুষের কাছে জমি বিক্রি করে পরবর্তীতে তা নামজারি (খারিজ) ও রেজিস্ট্রি না দিয়ে বছরের পর বছর হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুই দশক আগে জমি কিনেও রেজিস্ট্রি ও খারিজের জন্য শত শত বার তহসিল ও এসিল্যান্ড কার্যালয়ে ঘুরতে হচ্ছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভুক্তভোগীরা। তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মীর ফিরোজ আলী দাবি করেন, তার বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় নিজের অংশ তাকে লিখে দিয়েছেন। বর্তমানে তার নামে দলিল, নামজারি ও হোল্ডিং রয়েছে। পূর্বের একটি নামজারিতে ভুল ছিল স্বীকার করে তিনি জানান, সেটি সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুই ধরনের ভিন্ন ওয়ারিশান সনদ ইস্যুর বিষয়ে ৩নং ঝিলিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম লুৎফুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। আইনগত দিক তুলে ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ আজাদুল হেলাল জানান, নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী এনআইডিতে কেবল জন্মদাতা পিতা-মাতার নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। পালিত পিতা-মাতার নাম ব্যবহার করে তথ্য গোপন করা ভোটার তালিকা ও এনআইডি আইন অনুযায়ী স্পষ্ট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইকরামুল হক নাহিদ জানান, ওয়ারিশ সনদ গোপন বা জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি করা হয়ে থাকলে, তদন্ত সাপেক্ষে তা রিভিউর মাধ্যমে বাতিল করার আইনি সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে তথ্য গোপন ও প্রতারণার অপরাধে ভুক্তভোগীরা আদালতে ফৌজদারি মামলাও করতে পারবেন। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে কোটি কোটি টাকার জমি দখল ও সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি, প্রকৃত ওয়ারিশদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।