সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৭
উপসম্পাদকীয়

সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে দাম্পত্যের ভূমিকা কতটুকু?

রেহানা ফেরদৌসী ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:০৪ অপরাহ্ন শিক্ষা ও সাহিত্য
রেহানা ফেরদৌসী ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:০৪ অপরাহ্ন
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে দাম্পত্যের ভূমিকা কতটুকু?

একটি শিশুর বেড়ে ওঠায় বাবা-মায়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রভাব। একটি সন্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে একজন পুরুষ যেমন বাবা হয়ে ওঠেন, তেমনি একজন নারী মা হয়ে ওঠেন। কিন্তু সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু তাকে ভালোবাসা, ভরণপোষণ কিংবা শিক্ষার ব্যবস্থা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ, পারিবারিক সম্পর্কের সৌন্দর্য এবং মা-বাবার পারস্পরিক আচরণও তার মানসিক ও নৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ পরিবার নিয়ে আলোচনায় আমরা অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ককে আলাদাভাবে দেখি। তাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক যে সন্তানের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে, তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি না।

পরিবারই সন্তানের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-একটি শিশু প্রথমে পরিবার থেকেই ভালোবাসা, সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের অর্থ বুঝতে শেখে। মা-বাবার কথাবার্তা, একে অপরের প্রতি যত্ন এবং দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়ে সে সম্পর্কের সৌন্দর্য উপলব্ধি করে। বাবা মায়ের কথা মন দিয়ে শুনছেন, তার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন কিংবা প্রয়োজনে তার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, এমন অভিজ্ঞতা শিশুকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্য বুঝতে সাহায্য করে।

একইভাবে, মা-বাবা যখন মত পার্থক্যের মধ্যেও একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রাখেন, তখন সন্তান শেখে যে ভিন্নমত থাকা মানেই সম্পর্কের অবনতি নয়। বরং বোঝাপড়া, ধৈর্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ককে সুন্দর রাখা সম্ভব। অর্থাৎ, সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা শুধু তাকে কী বলতে হবে, তা শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজেরা কেমন আচরণ করছি, তার মধ্য দিয়েও সেই শিক্ষা দিতে হয়।

ভালো স্বামী হওয়া কেন ভালো বাবা হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত?

স্বামী ও বাবা-একজন পুরুষের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রতিটি ভূমিকার আলাদা দায়িত্ব থাকলেও তাদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র রয়েছে। জীবনসঙ্গীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা, সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজনে তার পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষের পারিবারিক মূল্যবোধেরই প্রকাশ। একজন পুরুষ যখন নিজের স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হন, তখন তিনি শুধু তাদের দাম্পত্য সম্পর্ককেই সমৃদ্ধ করেন না, পরিবারের জন্যও একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। এই পরিবেশ সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ধারণা বিকাশে সহায়ক হতে পারে। অবশ্য ভালো স্বামী হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো বাবা হয়ে যাওয়া নয়। সন্তানের প্রতি মনোযোগ, সময়, মমতা ও দায়িত্বশীলতারও স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। তবে জীবনসঙ্গীর প্রতি সম্মান ও যত্নের চর্চা একজন পুরুষের পিতৃত্বকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ পরিবারে দায়িত্বশীলতার যে মূল্যবোধ তিনি ধারণ করেন, তার প্রতিফলন বিভিন্ন সম্পর্কেই ঘটতে পারে।

দায়িত্ব কি শুধু অর্থনৈতিক অবদানে সীমাবদ্ধ? সন্তানের খাবার, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পরিবারের আর্থিক চাহিদা পূরণে যিনি পরিশ্রম করেন, তার অবদানও যথাযথ সম্মানের দাবিদার। তবে একটি পরিবারের সুস্থতা শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতার ওপর নির্ভর করে না। সন্তানকে সময় দেওয়া, তার কথা শোনা, মানসিক চাহিদা বোঝা এবং তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে যুক্ত থাকা যেমন জরুরি, তেমনি জীবনসঙ্গীর অনুভূতি ও প্রয়োজনের প্রতিও মনোযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সংসারের কাজ ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে একে অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা সম্পর্ককে দৃঢ় করে। এখানে কোনো একটি অবদানকে অন্যটির চেয়ে বড় করে দেখার প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানসিক সমর্থন, সন্তান লালন-পালন এবং দাম্পত্যের যত্ন-সবকিছু মিলেই একটি পরিবারকে সুস্থ ও সুন্দর করে তোলে।

পারস্পরিক সম্মানেই পরিবার হয়ে ওঠে শক্তিশালী-স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মত পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। দুটি ভিন্ন মানুষের চিন্তা, পছন্দ ও প্রত্যাশা সব সময় এক হবে না। কিন্তু সেই পার্থক্যকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই সম্পর্কের গুণগত মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের কথা শোনা, ভুল হলে তা স্বীকার করা, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং মতবিরোধের মধ্যেও মর্যাদা বজায় রাখা একটি সুস্থ দাম্পত্যের ভিত্তি। এ ধরনের সম্পর্কের সুফল শুধু স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই ভোগ করেন না, সন্তানও এর মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ পায়। সে উপলব্ধি করতে শেখে, ভালোবাসা মানে শুধু অনুভূতি প্রকাশ নয়, বরং দায়িত্ব পালন, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং সম্পর্ককে যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। তাই একজন ভালো বাবা হওয়ার আলোচনায় তার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তানের মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের দিকটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একইভাবে, একজন মায়ের ভূমিকাও কেবল সন্তানের যত্নে সীমাবদ্ধ নয়, পরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক সুন্দর রাখার ক্ষেত্রে মা-বাবা দুজনেরই ভূমিকা রয়েছে। সুন্দর পরিবার গড়ার দায়িত্ব সবার। একটি পরিবারে কেউ একা সবকিছু গড়ে তোলেন না। স্বামী-স্ত্রীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়েই পরিবার এগিয়ে যায়। বাবা-মা যখন একে অপরের অবদানকে স্বীকৃতি দেন, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখেন এবং সন্তানের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করেন, তখন পরিবারে ইতিবাচক মূল্যবোধের চর্চা আরও সুদৃঢ় হয়।

একজন ভালো স্বামী হওয়া ভালো বাবা হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়, তবে এটি দায়িত্বশীল পিতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কারণ জীবনসঙ্গীর প্রতি সম্মান, যত্ন ও সহমর্মিতা চর্চা করার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ পরিবারে এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে অবদান রাখেন, যেখানে সন্তান ভালোবাসার পাশাপাশি মানবিক সম্পর্কের মূল্যও শিখতে পারে। সন্তানের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চাইলে শুধু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলেই হবে না, তার বর্তমান পারিবারিক পরিবেশকেও সুন্দর করে তুলতে হবে। আর সেই সৌন্দর্য গড়ে ওঠে মা-বাবার পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে। কারণ সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম সুন্দর উপায় হলো, তার সামনে নিজেরাই সুন্দর সম্পর্কের উদাহরণ হয়ে ওঠা।



লেখক পরিচিতি: রেহানা ফেরদৌসী


রেহানা ফেরদৌসী একজন কলামিস্ট ও ভয়েস আর্টিস্ট। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত কলাম লিখেন, যেখানে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ে সহজভাবে কথা বলেন। তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি বিশ্লেষণধর্মী লেখা, সমসাময়িক সমাজ, সংকট ও নানামুখী সমস্যাবলিকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। তার লেখায় বাস্তবতা, সচেতনতা ও চিন্তার গভীরতার সুষম প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে আবৃত্তি ও তথ্যচিত্রে তাঁর কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ও সমাদৃত। তিনি কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের সহসভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নারীর কল্যাণে কাজ করছেন।