মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৭
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু

ফ্যামেলি কার্ড বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিনিধি ১২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৫১ অপরাহ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিনিধি ১২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৫১ অপরাহ্ন
ফ্যামেলি কার্ড বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সংবাদ সম্মেলন

নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহ করে অনলাইন ডেটাবেইজ তৈরি করা হবে। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ উপলক্ষে সোমবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আয়োজিত এ ব্রিফিংয়ে কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ আনিসুর রহমান। এসময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মারুফ আফজাল রাজন। উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিদ্দীকা সোহেলী রশীদ, জেলা তথ্য কর্মকর্তা রূপ কুমার বর্মন, সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মোঃ ময়েজ উদ্দীন, লেখক-গীতিকার ও জেলা জাসাস এর সভাপতি মোহাঃ জোনাব আলী, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মীম ফজলে আজিম, আব্দুর রহমান অনু, সারওয়ার জাহানসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো পরিবারের নারীপ্রধানের নামে কার্ড প্রদান এবং আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে যোগ্য পরিবারকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা। এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করা, স্বচ্ছতার সঙ্গে ভাতা বিতরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরুর কথা জানানো হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৬, ১২ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ও দেবীনগর ইউনিয়নেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলায় নয়ালাভাঙ্গা ও পাঁকা ইউনিয়ন এবং শিবগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।


গোমস্তাপুর উপজেলায় আলীনগর, বাঙ্গাবাড়ী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এবং ভোলাহাট উপজেলার ভোলাহাট, গোহালবাড়ী ও দলদলী ইউনিয়নে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হবে। পরে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে উপকারভোগী ৭৯ হাজার ৮৩১ জন-প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। পাইলটিং পর্যায়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) স্কোর অনুযায়ী নির্বাচিত ৭৯ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমে বরাদ্দ ছিল ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা উপকারভোগীদের ভাতা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে যোগ্য সব নারী পরিবারপ্রধানকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের নারীদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


এদিকে, দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োজিত কর্মীরা বিশেষায়িত ট্যাবলেট ডিভাইস ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশব্যাপী আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেইজে সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবের ক্ষেত্রে গড়ে প্রতি পাঁচজন সদস্যকে একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কার্যক্রমটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে মোবাইল সিম সংগ্রহ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) স্থাপনের মতো প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এ পদ্ধতিতে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা মূল্যায়ন করে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। শ্রেণিগুলো হলো—অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পিএমটি স্কোর ৮৬০ বা তার কম হলে নারী পরিবারপ্রধান ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ নিম্ন স্কোরের পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, সব নারী পরিবারপ্রধান ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। তবে ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা ও পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে। উপকারভোগীদের জন্য তৈরি ফ্যামিলি কার্ডে ডুয়াল চিপ, কিউআর কোড এবং নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তির সুবিধা থাকবে।


কার্ডটি সরকারের ‘টাকাপে’ (TakaPay) পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতার অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থা চালু হলে ভাতা গ্রহণ সহজ হবে এবং অর্থ বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্যভাণ্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’। নির্দেশিকা অনুসারে, তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন। পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পিএমটি পদ্ধতিতে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ আনিসুর রহমান কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এসময় জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকর্মী উপস্থিত ছিলেন।