স্মৃতির পাতায় অমলিন রিংকু ॥ দোয়া মাহফিলে বন্ধুদের চোখে জল
বন্ধুত্বের বাঁধন ছিন্ন করে মানুষ চলে যান না-ফেরার দেশে, কিন্তু রেখে যান অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা আর এক বুক শূন্যতা। যে মানুষটি একসময় বন্ধুদের আড্ডায় মাতিয়ে রাখতেন, হাসি-আনন্দে ভরিয়ে দিতেন চারপাশ, আজ তাঁরই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হতে হলো প্রিয়জনদের। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে যাওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক ওবাইদুল আজিম রিংকুর স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে এমনই এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বাদ মাগরিব জেলা শহরের ‘নবাবগঞ্জ ক্লাব’ মিলনায়তনে এ স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রয়াত রিংকুর এসএসসি ১৯৯৩ ব্যাচের সহপাঠী বন্ধুরা এ আয়োজন করেন। প্রিয় বন্ধুকে হারানোর বেদনা, একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি আর তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলনায়তনে সমবেত হন বন্ধু, স্বজন, ব্যবসায়ী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছে ওবাইদুল আজিম রিংকু ছিলেন আপনজন, সহমর্মী একজন মানুষ।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সমাজের মানুষের সঙ্গে তাঁর গড়ে উঠেছিল নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু প্রাণঘাতী ডেঙ্গু কেড়ে নেয় তাঁর জীবন। চলতি মাসের ৬ অক্টোবর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহীর একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যাঁর সঙ্গে একসময় স্কুলজীবনের স্মৃতি ভাগাভাগি করেছেন, একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন, জীবনের নানা বাঁকে পাশে পেয়েছেন—সেই বন্ধুর বিদায় মেনে নেওয়া সহজ নয়। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিগুলোই এখন স্বজন ও বন্ধুদের কাছে হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ। বন্ধুর স্মৃতিচারণে আবেগঘন পরিবেশ-স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন রিংকুর বন্ধু মো. শফিকুল ইসলাম শাফিক। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ ও দোয়া পরিচালনা করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ মাওলানা মো. আব্দুল মতিন। উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. সামিউল হক লিটন, নাজমুল হক ননী, সাবেক কাউন্সিলর শাহনেওয়াজ খান সিনা, এসএসসি ১৯৯৩ ব্যাচের ডা. এম. এ. মুর্শেদ জামান মিয়া, আওরাঙ্গজেব সুলতান বুলেট এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের মো. সোহেল। এছাড়া ওবাইদুল আজিম রিংকুর ব্যবসায়ী বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা প্রয়াত রিংকুর সঙ্গে তাঁদের কাটানো সময়ের স্মৃতি তুলে ধরেন এবং তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। প্রিয় বন্ধুর চলে যাওয়া যে তাঁদের জীবনে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে, সে অনুভূতিই উঠে আসে স্মরণসভায়। জীবনের ব্যস্ততায় হয়তো প্রতিদিন দেখা হতো না, কিন্তু বন্ধুত্বের টান যে অটুট ছিল, প্রিয়জনকে স্মরণ করতে একত্র হওয়াই তার প্রমাণ। মানুষের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, কিন্তু তাঁর ব্যবহার, আন্তরিকতা, ভালোবাসা আর মানুষের সঙ্গে গড়ে তোলা সম্পর্ক বেঁচে থাকে অন্যদের স্মৃতিতে। রিংকুর স্মরণসভায়ও সেই চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন ঘটে। স্মরণসভা শেষে প্রয়াত ওবাইদুল আজিম রিংকুর আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। মহান আল্লাহ যেন তাঁর জীবনের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দেন, এ কামনা করেন উপস্থিত সবাই। প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ধরে রাখতে আয়োজকেরা একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ৩০টি পবিত্র কোরআন শরিফ দান করেন। তাঁদের এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রিয় বন্ধুর জন্য দোয়া ও ধর্মীয় কল্যাণমূলক কাজের একটি স্মারক রেখে যাওয়ার প্রয়াস দেখা যায়।
বন্ধু হারানোর কষ্ট কোনো আয়োজনেই মুছে ফেলা যায় না। সময়ের সঙ্গে শোক হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়, কিন্তু প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি বারবার মনে করিয়ে দেয় তাঁর শূন্যতার কথা। ওবাইদুল আজিম রিংকু আর বন্ধুদের আড্ডায় ফিরে আসবেন না, পরিচিতজনদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন না জীবনের নতুন কোনো গল্প। তবে তাঁর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো, বন্ধুত্বের স্মৃতি আর প্রিয়জনদের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে দীর্ঘদিন। রিংকুর অকালমৃত্যু ডেঙ্গুর ঝুঁকি এবং এডিস মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের গুরুত্বও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ডেঙ্গুকে অবহেলা না করে জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। একটি পরিবারের প্রিয়জন, বন্ধুদের কাছের মানুষ কিংবা সমাজের পরিচিত মুখ, একজন মানুষের চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের জীবনে শূন্যতা তৈরি করে। ওবাইদুল আজিম রিংকুর স্মরণসভা তাই শুধু একজন প্রয়াত বন্ধুকে স্মরণ করার আয়োজন নয়;
এটি বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, মানবিকতা এবং জীবনের অনিশ্চয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রিয় বন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাই দোয়া করেন-মহান আল্লাহ যেন ওবাইদুল আজিম রিংকুকে ক্ষমা করে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমিন। এটাই ছিলো বন্ধু-আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্খীদের কামনা।