বুধবার, আগস্ট ১৯, ২০২৭
সার সংকটে আমনের মাঠ-শঙ্কায় কাঙ্খিত উৎপাদন

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ-প্রয়োজন তদারকির

চাঁপাই দর্পণ ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৭:২৮ অপরাহ্ন কৃষি
চাঁপাই দর্পণ ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৭:২৮ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ-প্রয়োজন তদারকির

বর্ষার সবুজে ধীরে ধীরে ভরে উঠছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাঠ। কোথাও জমি প্রস্তুত, কোথাও চলছে চারা রোপণ, আবার কোথাও রোপণ করা ধানের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। কিন্তু আমন মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। গোমস্তাপুরে ডিলারের কাছে চাহিদামতো সার না পেয়ে গত বুধবার (১২ আগস্ট) উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন রহনপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সারসংকটের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তারা। কৃষকের এই বিক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষার কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক এলাকায় আমন আবাদে সেচের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। এর সঙ্গে সার সংকট যুক্ত হলে কৃষকের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টরের বিশাল কর্মযজ্ঞ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিতে আমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। চলতি ২০২৬ মৌসুমে জেলার ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বড় একটি অংশে ইতোমধ্যে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এবারের আমন মৌসুম শুরু থেকেই কৃষকের জন্য স্বস্তির নয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ও সেচ ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয়ও কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে কৃষকের প্রশ্ন-যেখানে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত হবে কীভাবে? সারের চাহিদা বনাম সরবরাহ-আমন চাষে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, ডিএপি ও অন্যান্য সারের প্রয়োজন হয়। তবে জেলার চলতি মৌসুমের সরকারি অনুমোদিত সার-চাহিদা ও বরাদ্দের পূর্ণাঙ্গ টনভিত্তিক তালিকা প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া না যাওয়ায় যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সমীচীন নয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, সারের প্রকৃত কৃষি-চাহিদা, সরকারি বরাদ্দ এবং ডিলারের মাধ্যমে উত্তোলন-তিনটি এক বিষয় নয়। কৃষকের মাঠে সার পৌঁছেছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির বিপুল আবাদে প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত করতে হলে উপজেলা ও ইউনিয়ন ভিত্তিক চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। একই সঙ্গে ডিলাররা নিয়মিত বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন কি না, উত্তোলকৃত সার কৃষকের কাছে বিক্রি না করে ফড়িয়া বা সংশ্লিষ্ট এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের কাঝে বেশী দামে বিক্রি করে কৃষককে জিম্মি করা হচ্ছে কি না, অতিরিক্ত দামে কৃষক সার কিনতে বাধ্য হচ্ছে কি না? সেটিও কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন। গোমস্তাপুরের সাম্প্রতিক ঘটনায় কৃষকদের অভিযোগ ছিল, ডিলারের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ডিলার সার উত্তোলন না করায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যা যদি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় হয়, তাহলে দ্রুত প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সেটি সমাধান করা সম্ভব। উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ-চলতি মৌসুমে জেলার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর হলেও ২০২৬ সালের চূড়ান্ত জেলা-ভিত্তিক আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার টনভিত্তিক সরকারি সংখ্যা প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনুমান নির্ভর কোনো সংখ্যা দিয়ে কৃষকদের বিভ্রান্ত করা ঠিক হবে না। তবে, অতীতের উৎপাদনচিত্র থেকে আমনের গুরুত্ব বোঝা যায়। একাধিক প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আমন চাষ এবং প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি চাল উৎপাদনের সম্ভাবনার তথ্য পাওয়া গেছে। এবার ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করতে হলে আবহাওয়া, সেচ, সার, বীজ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা-সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জরুরি। সময়মতো সার না পেলে ক্ষতি কার?-ধানের গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ না হলে কৃষক শুধু অতিরিক্ত খরচের মুখেই পড়েন না, ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে আমন ধানের বিভিন্ন বৃদ্ধিপর্যায়ে সুষম পুষ্টি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সার থাকলেও যদি তা কৃষকের প্রয়োজনের সময় দোকানে না থাকে, তাহলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকার অর্থ খুব বেশি ভালো নয়। কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোই হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থার সফলতার আসল মাপকাঠি। এ কারণেই গোমস্তাপুরের বিক্ষোভ প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি ইউনিয়ন ভিত্তিক সার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

নাচোলের বরেন্দা এলাকার এক কৃষক জানান, বর্তমানে কৃষকের জমিতে জরুরী সার দরকার। কিন্তু প্রকৃত সার ডিলারদের কাছ থেকে সরকারের দেয়া সঠিক দামে সার পাচ্ছে না অনেক কৃষক। তবে, বেশি দাম দিয়ে কৃষক খুচরা সার বিক্রেতার কাছ থেকে সার কিনে জমিতে দিচ্ছে। তারপরও সময়মত পাচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রকৃত সার ডিলারদের কাছে লাইন দিয়ে কৃষক সার কিনতে যাচ্ছে, ডিলারের সার শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষকই সার পাচ্ছে না। একান্ত বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনে জমিতে দিচ্ছেন কৃষক। তিনি আর জানান, ৫০ কেজির বস্তা, ডিএপি ১৭০০ টাকা, ইউরিয়া ১৪০০ টাকা এবং পটাশ ১২০০ টাকা দরে বিক্রি করছে খুচরা বিক্রেতারা। কিন্তু প্রকৃত ডিলারের কাছে সারের দাম অনেকটা কম। সার বুঝে কয়েকশ টাকার ব্যবধান। তিনি বলেন, সরকারের উচিত বিষয়গুলো সরজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। অন্যথায় ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষক। এছাড়া সময়মত এবং নির্ধারিত দামে সার কিনতে না পারলে কাঙ্খিত ফলাফলও পাওয়া যাবে না। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিলার ব্যবসায়ী জানান, জেলায় সারের সংকট সৃষ্টি এবং দাম বৃদ্ধি করছে বিএডিসি’র ডিলাররা। বিএডিসি’র ডিলাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছে, খুচরা বিক্রেতারা আরও বেশী দাম নিয়ে বিক্রি করছে। এভাবেই সারের দাম বৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করছে, কৃষক বাধ্য হয়ে সার কিনছে। বিষয়গুলো তদারকি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। অন্যথায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হওয়ায় সরকারের ভাবমুর্তি নস্ট হবে। তিনি এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও জোর দাবী জানান। 

প্রয়োজন স্বচ্ছ বিতরণব্যবস্থা-সারসংকট নিরসনে প্রথমেই উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করা দরকার। কোন এলাকায় কত জমিতে আমন হচ্ছে, কত কৃষক সার নিচ্ছেন, কত বরাদ্দ এসেছে, কত উত্তোলন হয়েছে এবং কতটুকু কৃষকের হাতে পৌঁছেছে-এসব তথ্য প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে হালনাগাদ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে ডিলারদের দোকানে দৃশ্যমানভাবে সারের মূল্য তালিকা টাঙানো, বিক্রির হিসাব সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের কাছে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকেরাও চান না সার নিয়ে কোনো অস্থিরতা তৈরি হোক। তারা চান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় সার যেন সহজে পাওয়া যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির আমন শুধু একটি কৃষি লক্ষ্যমাত্রা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার কৃষক পরিবারের আয়-ব্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি। এবার বৃষ্টির ঘাটতিতে সেচ খরচ বেড়েছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ধানের বাজারদর নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। এর মধ্যে সার সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আমন আবাদে কৃষকের আগ্রহ ও উৎপাদন, দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই গোমস্তাপুরের কৃষকদের বিক্ষোভকে প্রশাসনের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। ডিলারদের নিয়মিত সার উত্তোলন নিশ্চিত করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের হাতে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমনের মাঠে কৃষকের স্বপ্ন এখন সবুজ হয়ে উঠছে। সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে হলে শুধু আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না, সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ কৃষি উপকরণও কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। সারের সংকট যেন ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর আমন মাঠের উৎপাদন সম্ভাবনাকে সংকটে না ফেলে, এখনই সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। কৃষকের মাঠে সার পৌঁছানো মানেই শুধু একটি কৃষি উপকরণ পৌঁছানো নয়, এর সঙ্গে পৌঁছে দেয়া হয় একটি পরিবার, একটি গ্রাম এবং একটি জেলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।