পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করব ॥ পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে-প্রধানমন্ত্রী
পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নদী দুটিতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে দেশের পানিসংকট দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজশাহী নগরীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান বলেন, রাজশাহীর পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নদী পদ্মা ও তিস্তায় ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে পানিসংকট দূর করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব। দরকার হলে বাংলাদেশের মানুষের পানির হিস্যা আদায় করার জন্য যতদূর যেতে হয়, আমরা চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশের পানির হিস্যা আমরা নিয়ে আসার চেষ্টা করব। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের নির্মাণকাজ শুরু করা হবে এবং তা শেষও করা হবে। কৃষকদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন,
সারা দেশে প্রায় চার হাজার আখচাষিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আগামী মৌসুমে আখচাষিদের কিছুটা হলেও দুর্ভোগ কমবে। তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, ‘দেশের কৃষক বাচলে-কৃষি বাচবে’। জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর কৃষকদের পাশে দাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। সরকার গঠনের সাত দিনের মাথায় সারা দেশের ১৩ লাখ কৃষকের এই ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কর্মসূচির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক, ভূমিহীন ও বড় কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে তালিকা তৈরির কাজ শেষ হলে ধাপে ধাপে কৃষকদের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি জানান, চলতি বছর সারা দেশে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড পৌছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বছরে দুই বা তিনটি ফসল উৎপাদনকারী কৃষকদের অন্তত একটি ফসলের জন্য সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহের চেষ্টা করবে সরকার। এর মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। এছাড়া কৃষক কার্ড ব্যবহার করে কৃষকেরা তাদের ফসলের বিমা করতে পারবেন। ব্যাংকঋণ নিতে চাইলেও এ কার্ডের মাধ্যমে সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হবে। দেশে খাল খনন ও নদী সংস্কার কর্মসূচি পুনরায় চালুর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে এ কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী পাচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গত আট মাসে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তারেক রহমান বলেন, খাল খনন ও নদী সংস্কারের ফলে কৃষকেরা সেচের পানির সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট পানিসংকট কমাতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে। খাল খননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও সহায়তা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালটিতে এক হাজার ৩০০ শয্যা রয়েছে। এ সংখ্যা বাড়িয়ে দুই হাজার ৫০০ করা হবে। এছাড়া আগামী পাচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হলে গ্রামের মানুষকে ছোটখাটো অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য দূরের জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হবে না। এতে স্থানীয় পর্যায়েই স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে, রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মাঝে ১২ কোটি প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার রাজশাহীর হাজী মুহাম্মদ মহসীন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আখচাষিদের প্রণোদনা প্রদান ও জনসভায় প্রধানমন্ত্রী কম্পিউটারে বোতাম টিপে এই অর্থ সংশ্লিষ্ট চাষীদের মোবাইল একাউন্টে প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার আখচাষিদের সহযোগিতার জন্য মোট ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দের অর্থ ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমি আশা করছি কৃষকদের এ সহযোগিতা তাদের আখ চাষে সহায়তা করবে।’ প্রধানমন্ত্রী ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে কম্পিউটারের বোতাম চাপেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় জনসভাস্থলে উপস্থিত হাজারো মানুষও সমস্বরে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করে এবং উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে ১৫ জন আখচাষির হাতে চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। চেকপ্রাপ্ত আখচাষিরা হলেন-আবু সাঈদ,
আবদুল আউয়াল মালেক, আবদুল মান্নান মন্ডল, এমাজ উদ্দিন, কাহার, গোলাম রাব্বানী, সবিতা রানী, জালাল উদ্দিন মৃধা, জিয়াউল হক, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মাজেদ, নিরান্দ কুমার ঘোষ, শামীমুর রহমান, রীমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এই সমাবেশে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে হাজার হাজার নেতা-কর্মী অংশ নেন। জনসভায় সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী ও পুরুষরা ছিলেন। এর আগে জনসভাস্থলে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে সেখানে উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা তাকে স্বাগত জানান। জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন,
রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইটসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। জনসভা শেষে রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে একটি সামরিক বিমানে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে রওনা দিয়ে ২টা ৫৫ মিনিটে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ পিপিএম, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার ফয়জুল কবির পিপিএম, জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশিদ। রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী।