শুক্রবার, আগস্ট ০৭, ২০২৭
‘জুলাই শহীদ’ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি, দোয়া, শহীদদের সমাধিতে পুস্পঞ্জলি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী

চাঁপাইনবাবগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উদযাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০৭ অপরাহ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উদযাপন

‘জুলাই শহীদ’ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি, দোয়া, জুলাই শহীদদের সমাধিতে পুস্পঞ্জলি অর্পণ, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরনী সহ নানা আয়োজনে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উদযাপন হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।


‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে বুধবার ‘৫ আগস্ট’ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে জেলা শহরের ফুড অফিস মোড় এলাকায় স্থাপিত ‘জুলাই শহীদ’ স্মৃতিসৌধে সকাল ৯টায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, নবাবগঞ্জ মহিলা সরকারী কলেজ, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শহীদ পরিবারসহ নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন।


‘জুলাই শহীদ’ স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে জুলাই শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং আহত যোদ্ধাদের সুস্থতা কামনা করে দোয়া করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যলয় চত্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত মঞ্চে আলোচনা সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নাতিপ্রাপ্ত) আবু ছালেহ মো: মুসা জঙ্গী। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ, পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস, সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন, জেলা বিএনপির আহবায়ক গোলাম জাকারিয়া, সদস্য সচিব আলহাজ্ব মোঃ রফিকুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মোখলেশুর রহমান,


বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা আহবায়ক আব্দুর রাহিমসহ এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ নেতৃবৃন্দ ও জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং জুলাই যোদ্ধারা। শেষে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিগণ। এসময় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ ও শিক্ষার্থী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে জেলার ২জন জুলাই শহীদের সমাধিতে পুস্পার্ঘ অর্পণ ও তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।


গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই আন্দোলনের বীর যোদ্ধাদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা এবং গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে বক্তৃতার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯টায় জেলা প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিভিল সার্জন কার্যালয়, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)সহ বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সামাজিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।


পরে সকাল ১০টায় (চাঁপাইনবাবগঞ্জ মঞ্চ)-এ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল-“জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শহীদদের আত্মত্যাগ, আন্দোলনের তাৎপর্য এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এ আন্দোলনের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশীদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) উজ্জ্বল কুমার ঘোষ, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া, সদস্য সচিব আলহাজ্ব মোঃ রফিকুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. মোখলেশুর রহমান, জুলাই শহীদের পিতা মো. আসাদুল ইসলাম,ছাত্রশিবিরের শহর শাখার সভাপতি মো. ইউসুফ গালিব, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব মো. নজরুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলমগীর কবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।


এছাড়াও অনুষ্ঠানে ঢাকায় শহীদ মতিউর রহমানের স্ত্রী মোসা. রোজিনা খাতুন ও মেয়ে ইসরাত জাহানসহ জুলাই যোদ্ধা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাগণ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, জেলার বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি আন্দোলন নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। তাঁরা বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই চেতনাকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।


আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে। এজন্য রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদদের পরিবারের সদস্যদের ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক ও শুভেচ্ছা উপহার প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেওয়া জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা জানানো হয়। আবেগঘন এই আয়োজনে অনেক শহীদ পরিবারের সদস্য তাঁদের স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণ করেন, যা উপস্থিত অতিথিদের আবেগাপ্লুত করে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং সামাজিক সংগঠনেও আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও স্মরণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।


দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন, গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ইতিহাস তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেই একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সকলের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এছাড়া ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে জেলার সকল উপজেলায় নানা কর্মসূচী পালন করা হয় এবং জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। অন্যদিকে, দিবসটি উপলক্ষে বারঘরিয়া গোল চত্বর, হরিমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, নামোশংকরবাটী উচ্চ বিদ্যালয়, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সামনে প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে হাসপাতাল, জেলখানা, শিশু পরিবার, ইয়াতিমখানায় প্রীতিভোজ, আলোকসজ্জাসহ নানা কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। অন্যদিকে, জেলার সকল সরকারী-বেসরকারী বিনোদমূলক স্থান (কালেক্টরেট শিশুপার্কসহ উপজেলার অন্যান্য বিনোদসমূলক স্থানসমূহ) শিশুদের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিনা টিকিটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও ‘জুলাই শহীদ’ স্মৃতিস্তম্ভে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন হওয়ায় জেলাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নাতিপ্রাপ্ত) আবু ছালেহ মো: মুসা জঙ্গী। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক গৌরবোজ্জল ও স্মরণীয় অধ্যায়। দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের জনগণ এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ গ্রহণ করেন। তাঁদের মহান আত্মত্যাগ ও অবদানের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছে নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা।