কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে গুরুতর আহতের অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরাফাত রহমানকে মারধর করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে অতিথি শিক্ষক মো. কাওসার আযমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের আগেই ওই শিক্ষার্থীকে চুল ধরে টানা, দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী ইসলামী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর অভিভাবক চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতিথি শিক্ষক কাওসার আযমকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান। তবে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ এবং ঘটনার পর বিষয়টি গোপন রাখতে বলার অভিযোগ ঘিরে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকালে কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ‘ক’ শাখার শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়। সকালে বৃত্তি ক্লাসের প্রায় ৪৫ মিনিট পর পানি পান করার জন্য সে শ্রেণিকক্ষের বাইরে যায়। পানি পান শেষে শ্রেণিকক্ষে ফেরার সময় শ্রেণিশিক্ষক মো. মতিউর রহমানকে দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করে আরাফাত। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের আগেই অতিথি শিক্ষক কাওসার আযম তাকে ধরে মারধর শুরু করেন। অভিভাবকের দাবি, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়া বা কথা বলার সুযোগ না দিয়েই পেছন থেকে ধরে শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে তার মাথার চুল ধরে টানা, দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। এ সময় তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর অভিভাবকের প্রশ্ন, একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যাবে, নাকি শিক্ষকের ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাবে? শ্রেণিকক্ষে ফিরতে দেরি হলে কিংবা কোনো ভুল হলে তা বোঝানো বা অভিভাবককে জানানোই কি যথেষ্ট ছিল না? অভিভাবকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পর আরাফাতের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকলে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মাথা ও বুকে গুরুতর আঘাতের বিষয়টি জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী ইসলামী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অভিভাবকের দাবি, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরাফাত প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট অচেতন ছিল। কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরলেও শরীরে প্রচণ্ড দুর্বলতা ছিল। বর্তমানে আরাফাত চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান শিক্ষার্থীকে বিষয়টি বাড়িতে না জানাতে বলেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক। অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ জানতে চাইলে যেন আরাফাত বলে, বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলি চলাকালে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি বলে জানা গেছে। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরাফাতকে দেখতে আসা তার কয়েকজন সহপাঠীকে প্রধান শিক্ষক হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিভাবকের দাবি, ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আরাফাত নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে কয়েকজন সহপাঠী এগিয়ে এসে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীর প্রতি ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক কথাবার্তা বলার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘তোর কলিজা টেনে আজ বের করব’, এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিভাবকের দাবি, ঘটনার পর শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে যায়। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাকে অভিভাবকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক। এ বিষয়ে কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। অতিথি শিক্ষক কাওসার আযমকে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক বলেন, জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনার পর তিনি বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে হাসপাতালে আরাফাতকে দেখতে পাঠান। তিনি নিজেও বৃহস্পতিবার হাসপাতালে গিয়ে শিক্ষার্থীকে দেখে এসেছেন। তবে অতিথি শিক্ষক কাওসার আযমের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীকে বিষয়টি বাড়িতে না জানাতে বলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। অতিথি শিক্ষককে বরখাস্তের কথা প্রধান শিক্ষক জানালেও এ বিষয়ে কোনো লিখিত আদেশ বা বরখাস্তের আনুষ্ঠানিক নথি পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল মতিন বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের আরাফাত নামে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের বিষয়টি তাঁকে আগে কেউ জানাননি। অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে শিক্ষার্থীকে দেখতে যান। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীর উন্নত চিকিৎসার জন্য তার অভিভাবককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিভাবকের প্রশ্ন, কোনো শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার পরিবর্তে শ্রেণিশিক্ষক, প্রধান শিক্ষক কিংবা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেত না কি? তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীর আচরণে কোনো সমস্যা থাকলে তা সংশোধনের জন্য বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা প্রয়োজনে অভিভাবককে বিদ্যালয়ে ডেকে বিষয়টি আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ যাচাই না করে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনা ঘটলে তা শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। কালিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের এ অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক।